
দুর্গাপুর, ১২ সেপ্টেম্বর (হি. স.): বাইরে নজরদারিতে সিসি ক্যামেরা, আর ভেতরে বসে কম্পিউটার ও ল্যাপটপে চলছিল সাইবার প্রতারণার চক্র। আসানসোল- দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলকে ডেরা বানিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠা আন্তঃরাজ্য সাইবার প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে আবারও বড়সড় সাফল্য পেল কমিশনারেট পুলিশ। দুর্গাপুর থানার সাইবার পুলিশ বিভাগের অভিযানে ধরা পড়ল ১০ জন। উদ্ধার হয়েছে ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক এবং এটিএম কার্ডসহ বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও নথিপত্র।
শনিবার পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের নাম মুন্নু আনসারী, নাসিম আনসারী আদপে ঝাড়খন্ডের দেওঘরের পালাজুড়ির বাসিন্দা। দুর্গাপুর নঈমনগরে ডেরা বেঁধে ছিল। এছাড়াও সুলতান আনসারী, গনেশ রাও, প্রভাত সিং, শ্রীভান্ত মোদী, সুজল সাউ, আনন্দ সাউ, রোহিত তাঁতি, সোনু দেবনাথ দুর্গাপুর থানার সোনারতরী, নঈমনগর ও মসজিদ মহল্লার বাসিন্দা। ধৃতরা জামডাড়া গ্যাং এর যোগ রয়েছে বলে পুলিশের ধারনা। শনিবার ধৃতদের দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাদের জামিন খারিজ করে দু-দিনের পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ দেন। প্রসঙ্গত, গত কয়েকদিন ধরে কোনরকম ওটিপি লেনদেন, কোনরকম ফোন কল ছাড়াই গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ওই ঘটনার তদন্তে নেমে বড়সড় চক্রের হদিশ পায় আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের সাইবার বিভাগ।
এর আগের দিনই দুর্গাপুর স্টেশন বাজার সংলগ্ন সাধুডাঙার একটি লজে ডেরা বেঁধে থাকা ঝাড়খণ্ডের ৪ যুবককে গ্রেফতার করে কোকওভেন থানার পুলিশ। তার পরদিন দুর্গাপুর কাদারোড থেকে ৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারপর শুক্রবার দুর্গাপুর নঈমনগর, মসজিদ মহল্লা ও সোনারতরী সহ একাধিক জায়গায় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে মূল অভিযুক্ত মুন্নু আনসারী-সহ মোট ১০ জনকে গ্রেফতার করে। অভিযানের সময় মুন্নুর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে একাধিক নথি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ-সহ বেশ কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। তার বাড়ির বাইরে লাগানো সিসি ক্যামেরার মাধ্যমেও নজরদারি চালানো হতো বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে গত মাসে আসানসোলের নিয়ামতপুরে হরিজনপাড়ায় সাইবার প্রতারণার অভিযোগ উঠেছিল। সেই সময় ড্রোন নামিয়ে প্রায় ১০ ঘণ্টার অভিযানে ১১ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বিলাস বহুল বাড়িতে সিসি ক্যামেরা এবং সেন্সর গেট বসিয়ে জামতাড়া গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সাইবার চক্রটি পরিচালিত হচ্ছিল। সেখানেই অভিযান চালিয়ে ৩৫টি স্মার্টফোন, ৪৫টি এটিএম কার্ড, রাউডার ও ৩ লক্ষ টাকা উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও গত মাসে এমনই সাইবার প্রতারণার খবর এসেছিল বাঁকুড়া থেকে। সেখানকার রানিবাঁধ এলাকার জঙ্গল ঘেরা অঞ্চল থেকে ৭২ কোটি টাকার এক বিশাল সাইবার প্রতারণা চক্রের সঙ্গে যুক্ত ৭ জনকে গ্রেফতার করেছিল বাঁকুড়া জেলা পুলিশ। তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ট্র্যাকিং করে এটিএম লেনদেনের ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে তাদের চিহ্নিত করা হয়। ধৃতদের হেফাজত থেকে এই অপরাধের কাজে ব্যবহৃত ৩৪টি পাসবই, ১৩টি এটিএম কার্ড এবং ৯টি চেকবুক উদ্ধার হয়। তাছাড়া ৮টি মোবাইল, একটি ট্যাব, ৪২টি সিম, ৩টি ইউপিআই স্ক্যানার এবং ১৫টি ফ্ল্যাশ স্ট্যাম্প উদ্ধার করেছে পুলিশ। তারপর দুর্গাপুরে একের পর চক্র ধরা পড়ায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রশ্ন তাহলে কি দক্ষিনবঙ্গের জেলাগুলিকে ডেরা করে জামতাড়া গ্যাং এই সাইবার প্রতারনা চক্র চালাচ্ছিল? জানা গেছে, এই চক্রটি মুলত সিবিআই, পুলিশ বা ইডির ভুয়ো আধিকারিক সেজে ভিডিও কলের মাধ্যমে মানুষকে ভয় দেখিয়ে টাকায় আদায় করা। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার বা টেলিকম আধিকারিক সেজে ব্যাঙ্কের গোপন তথ্য নিয়ে এটিএম পিন বা ওটিপি চেয়ে কোনও না কোনও ভাবে অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে টাকা হাতিয়ে নেয়। আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার (পূর্ব) রাসপ্রীত সিং জানান, বেশ কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গিয়েছে এবং তদন্ত চলছে। পুলিশি হেফাজতে নিয়ে তদন্ত আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হবে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা