
আগরতলা, ১৯ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। পুজোর আর বেশি দেরি নেই। তাই রাজ্যজুড়ে এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে দুর্গা প্রতিমা নির্মাণের প্রস্তুতি। বড় থেকে ছোট—বিভিন্ন আকার ও নকশার প্রতিমা তৈরিতে দিনরাত ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা। মাটি, খড়, বাঁশ ও রঙের নিখুঁত ব্যবহারে ধীরে ধীরে রূপ পাচ্ছেন দেবী দুর্গা ও তাঁর পরিবার।
বামুটিয়া এলাকার বিভিন্ন মৃৎশিল্পীর কর্মশালাতেও এখন ব্যস্ততার শেষ নেই। বহুল পরিচিত সৃজা স্টুডিও, মা দুর্গা মৃৎ শিল্পালয়-সহ একাধিক কর্মশালায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। কোথাও চলছে কাঠামো তৈরির কাজ, কোথাও মাটির প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও প্রতিমার মুখমণ্ডল ও অঙ্গের সূক্ষ্ম কাজ সম্পন্ন করছেন শিল্পীরা। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিমার নকশা ও সাজসজ্জাতেও এসেছে নানা পরিবর্তন। সাবেকি প্রতিমার পাশাপাশি আধুনিক ভাবনার প্রতিমা তৈরির চাহিদাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন কারিগররা।
মৃৎশিল্পীদের কাছে এই সময়টা বছরের অন্যতম ব্যস্ত সময়। দুর্গাপুজোর আগে একসঙ্গে একাধিক প্রতিমার বরাত পাওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করাই এখন মূল লক্ষ্য। প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন দক্ষতা, ধৈর্য ও অভিজ্ঞতা। খড় দিয়ে কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে মাটি লাগানো, শুকানো, মসৃণ করা, রং করা এবং শেষ পর্যায়ে সাজসজ্জা—প্রতিটি কাজই অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে করতে হয়। ফলে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি কর্মশালার কারিগরদের নিয়েও চলছে জোর প্রস্তুতি।
তবে উৎসবের এই ব্যস্ততার মধ্যেও মৃৎশিল্পীদের একাংশের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা। তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে প্রতিমা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এই শিল্পের উন্নয়নে পর্যাপ্ত সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা ও সুযোগ-সুবিধা তাঁরা পাচ্ছেন না। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিকের খরচ এবং অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিমা তৈরির খরচও আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিমার মূল্য বাড়ানো সম্ভব হয় না। ফলে পরিশ্রমের তুলনায় উপার্জন কমে যাচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।
শিল্পীদের বক্তব্য, মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। দুর্গাপুজোর প্রতিমা নির্মাণের এই শিল্প বহু প্রজন্ম ধরে এক পরিবারের হাত থেকে অন্য প্রজন্মে চলে আসছে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন। আয়- রোজগারের অনিশ্চয়তা এবং পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তার অভাব এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তাঁরা।
মৃৎশিল্পীদের দাবি, সরকারি উদ্যোগে সহজ শর্তে ঋণ, আর্থিক সহায়তা, কাঁচামাল সংগ্রহে সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হলে এই শিল্প আরও এগিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি মৃৎশিল্পীদের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি প্রকল্প ও বাজারের সুযোগ তৈরি করা হলে তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তাও বাড়বে।
শিল্পীদের আরও দাবি, আগামী প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে যুক্ত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রশিক্ষণ শিবির, কর্মশালা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে মৃৎশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট করা সম্ভব বলে মনে করছেন তাঁরা। তাঁদের আশা, দুর্গাপুজোর মরশুমে প্রতিমা নির্মাণের ব্যস্ততার পাশাপাশি সরকার মৃৎশিল্পীদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলির দিকেও নজর দেবে। তবেই ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প বাঁচবে এবং নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আরও সমৃদ্ধ হবে।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ