প্রাক্তন জঙ্গিদের ডাকা ৭২ ঘন্টার অবরোধে স্তব্ধ ত্রিপুরা, সড়ক-রেল যোগাযোগে চরম ভোগান্তি
আগরতলা, ৪ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক শান্তিচুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলি অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবিতে আত্মসমর্পণকারী জঙ্গিদের ডাকা ৭২ ঘন্টার অবরোধে শুক্রবার কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ল ত্রিপুরার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভোর থেকে
রেল লাইনে অবরোধ


আগরতলা, ৪ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক শান্তিচুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলি অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবিতে আত্মসমর্পণকারী জঙ্গিদের ডাকা ৭২ ঘন্টার অবরোধে শুক্রবার কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ল ত্রিপুরার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভোর থেকেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবরোধ শুরু হওয়ায় আসাম-আগরতলা জাতীয় সড়কে যান চলাচল থমকে যায়। পাশাপাশি বৃগুদাস বাড়ি এলাকায় রেলপথ অবরোধের জেরে ট্রেন চলাচলও ব্যাহত হয়। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ যাত্রী ও পথচারীরা।

এদিন সকাল থেকেই এনএলএফটি (ওআরআই), এনএলএফটি (পিডি), এটিটিএফ, এনএলএফটি (এনবি), জেএআরসি, জেএসি এবং এটিটিএফ (ওল্ড)-এর সদস্যরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জড়ো হয়ে অবরোধে সামিল হন। বড়মুড়ায় সেতুর কাছে চন্দ্র সাধু পাড়া, খোয়াই চৌমুহানি এবং বৃগুদাস বাড়ি-সহ একাধিক এলাকায় টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তায় অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। মুহূর্তের মধ্যে জাতীয় সড়কে যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

অবরোধের জেরে রাস্তার দু’পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থাকে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক-সহ অসংখ্য যানবাহন। জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষ থেকে শুরু করে দূরপাল্লার যাত্রী—সকলকেই চরম দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়। কোথাও কোথাও বিক্ষোভস্থলের মধ্যে দিয়ে পথ করে যাওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায় পথচারীদের।

অন্যদিকে, বৃগুদাস বাড়ি এলাকায় রেলপথ অবরোধের ফলে ট্রেন চলাচলেও বড়সড় প্রভাব পড়ে। ট্রেন আটকে পড়ায় শত শত যাত্রী বিপাকে পড়েন। সড়ক ও রেল—দুই যোগাযোগ ব্যবস্থায় একসঙ্গে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় রাজ্যের স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়।

প্রশাসনের তরফে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অবরোধস্থলগুলিতে অতিরিক্ত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। পশ্চিম ত্রিপুরার পুলিশ সুপার নমিত পাঠক নিজে বিভিন্ন বিক্ষোভস্থল পরিদর্শন করেন। ঊর্ধ্বতন পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিকরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে অবরোধ প্রত্যাহারের জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি যাতে হাতের বাইরে না যায়, সেজন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিকে নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে রাখা হয়।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মহিলা সহ ৪০০-রও বেশি আন্দোলনকারী এই অবরোধে অংশ নেন। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় সরকার, ত্রিপুরা সরকার এবং সংশ্লিষ্ট জঙ্গি সংগঠনগুলির মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক শান্তিচুক্তির একাধিক প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। তাই শুধুমাত্র আশ্বাস নয়, এবার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চান তাঁরা।

প্রাক্তন জঙ্গিদের পক্ষ থেকে মোট ১১ দফা দাবি সামনে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান দাবি হল ত্রিপাক্ষিক শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। পাশাপাশি আত্মসমর্পণকারী জঙ্গি নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের তালিকা অনুমোদন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা বিচারাধীন পুলিশি মামলা প্রত্যাহারের দাবিও রয়েছে।

এছাড়াও ত্রিপুরা ট্রাইব্যাল এরিয়াস অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (টিটিএএডিসি)-এর জন্য ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষমতা-সহ বিভিন্ন বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের নেতাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের দাবিগুলি নিয়ে আলোচনা ও আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। এটিটিএফ নেতা সুকুমার দেববর্মা-সহ আন্দোলনের নেতারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে এলে অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু দাবিগুলি উপেক্ষা করা হলে আন্দোলন আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলেও তাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

তাৎপর্যপূর্ণভাবে, এই অবরোধের দিনই নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা এবং তিপ্রা মথার প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন-সহ ত্রিপুরার আদিবাসী সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেই সময়েই রাজ্যের রাস্তায় প্রাক্তন জঙ্গিদের অবরোধ নতুন করে চুক্তি বাস্তবায়নের প্রশ্নটিকে সামনে এনে দিয়েছে।

আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, আলোচনার টেবিলে দেওয়া আশ্বাস এবার বাস্তবায়নের মাটিতে দেখা যেতে হবে। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলেও তাঁরা সতর্ক করেছেন।

এদিকে ৭২ ঘণ্টার এই অবরোধ কতদূর গড়ায়, প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে অচলাবস্থা কাটে কি না—এখন সেটাই বড় প্রশ্ন। একদিকে শান্তিচুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি, অন্যদিকে অবরোধের জেরে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ—দুইয়ের মাঝে কার্যত কঠিন পরীক্ষার মুখে ত্রিপুরা সরকার ও প্রশাসন। আগামী কয়েক ঘন্টার আলোচনা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপই ঠিক করবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে, নাকি ৭২ ঘণ্টার অবরোধ আরও বড় অচলাবস্থার রূপ নেবে।

হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ




 

 rajesh pande