
সাব্রুম (ত্রিপুরা), ৬ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : একসময় নাটক, যাত্রাপালা, নৃত্য-গীত ও লোকসংস্কৃতির চর্চায় প্রাণবন্ত ছিল সাব্রুম। বাঙালির কর্মস্পৃহা ও আবেগ জাগানো সেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডন আজ অনেকটাই স্তব্ধ। নেই আগের মতো নাটকের মঞ্চ, শোনা যায় না যাত্রাপালার গর্জন। ধ্রুপদী নৃত্য থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার লোকসুর—একসময়ের পরিচিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ায় সাব্রুমে তৈরি হয়েছে গভীর সাংস্কৃতিক শূন্যতা।
এই পরিস্থিতিতে হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছে 'তরঙ্গ' কালচারাল একাডেমি। সংস্থার বার্ষিক সমাবর্তন অনুষ্ঠানকে ঘিরে সাব্রুমের পুরাতন টাউন হল রবিবার সন্ধ্যায় সাময়িকভাবে ফিরে পায় সাংস্কৃতিক প্রাণচাঞ্চল্য। নৃত্য ও গানের পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে হলঘর। তবে আনন্দের এই আবহের মধ্যেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্টজনদের বক্তব্যে উঠে আসে সাব্রুমের বর্তমান সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাব্রুমের মহকুমা শাসক সুমন রক্ষিত, বিশিষ্ট লেখক ও প্রকাশক বিজন বসু, লেখক তপন কান্তি বৈদ্য, শিক্ষক মৃণাল চক্রবর্তী, রাজীব চক্রবর্তী, বাচিক শিল্পী শুভঙ্কর দেবনাথ এবং সমাজসেবী পোশ্মি রায়চৌধুরী। বক্তারা সাব্রুমে সাংস্কৃতিক চর্চার ক্রমশ অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, একসময় যে অঞ্চলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পীদের নিয়মিত কর্মকাণ্ড দেখা যেত, বর্তমানে সেই ধারাবাহিকতা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ ও পরিকাঠামোর অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে অনুষ্ঠানে মত প্রকাশ করা হয়। ধ্রুপদী নৃত্য, সংগীত, আবৃত্তি কিংবা গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির মতো চর্চাগুলিকে বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মঞ্চ এবং পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় উদ্যোগের ঘাটতি থাকায় বহু প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে না বলেও অভিমত উঠে আসে।
এই সাংস্কৃতিক খরার মধ্যেই 'তরঙ্গ' কালচারাল একাডেমির ট্যালেন্ট হান্ট কর্মসূচি নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। উদীয়মান শিল্পীদের চিহ্নিত করে তাঁদের উৎসাহিত করা এবং পুরস্কৃত করার উদ্যোগ ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে। বার্ষিক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে খুদে ও তরুণ শিল্পীরা তাঁদের প্রতিভার প্রকাশ ঘটান। তাঁদের উৎসাহিত করতে পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান করা হয়।
সংস্থার কর্ণধার কমলকান্তি চৌধুরীর উদ্যোগের প্রশংসা করেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা। তাঁদের মতে, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া এবং নতুন প্রজন্মকে শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—শুধু একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে কি সাব্রুমের হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দীর্ঘমেয়াদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের মতে, সাব্রুমের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। নিয়মিত নাট্যোৎসব, যাত্রাপালা, লোকসংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজনের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও পর্যাপ্ত মঞ্চ তৈরি করা জরুরি। তবেই হারিয়ে যাওয়া শিল্পচর্চার ধারাকে ফেরানো সম্ভব হবে।
পুরাতন টাউন হলের মঞ্চে তরঙ্গের শিল্পীদের পরিবেশনা হয়তো কয়েক ঘন্টার জন্য সাব্রুমের সাংস্কৃতিক নীরবতা ভেঙেছে। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানই যেন বৃহত্তর এক প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—সাব্রুম কি আবার ফিরে পাবে তার হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক সোনালী দিন? উত্তর খুঁজতে হলে একক উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ