
নাগপুর, ২০ অক্টোবর (হি.স.): রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ মঙ্গলবার নাগপুরের রেশিমবাগে সংঘের শতবর্ষ পূর্তি উদযাপনের সমাপনী বছর উপলক্ষে বার্ষিক শ্রী বিজয়াদশমী উৎসবের আয়োজন করে। এ দিন সরসঙ্ঘচালক ডঃ মোহন ভাগবত শস্ত্র পূজা সম্পন্ন করেন। তিনি সংঘের প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের মূর্তিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন|
সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত এ দিন বলেন, স্বধর্ম রক্ষার জন্যই নিজেদের প্রাণ উৎসর্গকারী আর্যসমাজের তপস্বী সন্ন্যাসী, ধর্মে একনিষ্ঠভাবে বিশ্বাসী, জ্ঞানী শিক্ষাবিদ, বীর স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং শুদ্ধি আন্দোলনের জনক স্বামী শ্রদ্ধানন্দ জির বলিদানের ১০০ বছর পূর্ণ হয়েছে। সংঘের কাজও বিগত ১০০ বছর ধরে ভারতকে 'স্ব' (স্বকীয়তা), অস্মিতা-র ভিত্তিতে সংগঠিত ও বলীয়ান করার জন্য পরিচালিত হয়ে আসছে। সংঘের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে, জীবন পরিবর্তনের কারক পাঁচটি উদ্যোগের মধ্যে একটি হলো এই 'স্ব'-এর বোধ ও স্বদেশী অনুশীলনের উদ্যোগ।
এ দিন 'স্ব' বোধের ভিত্তি নিয়ে বলেন সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত| তিনি বলেন, আমাদের নিজেদের বিস্মৃতিকে দূর করে সেই তত্ত্বকেও স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে, স্বীকার করতে হবে এবং তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে গুণগত মান নির্মাণ করতে হবে। দেশের স্বাধীনতার জন্য যতটা তপস্যা ও সমর্পণ হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি দেখলে মনে হয় এখন তারচেয়েও অনেক বেশি প্রয়োজন পড়বে। তিনি বলেন, পঞ্চ পরিবর্তনের পাঁচটি উদ্যোগ— সম্প্রীতি, পারিবারিক জ্ঞানার্জন, পরিবেশ, আত্মোপলব্ধি, স্বদেশী এবং নাগরিক শৃঙ্খলা সমাজের সকল স্তরের মানুষের দ্বারা সমাদৃত হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে। এটি কেবল এক বছরের কর্মসূচি নয়, বরং এটি এমন এক আচরণবিধি যা জীবনকে রূপান্তরিত করে।
নতুন প্রজন্ম কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল তা বিচার না করেই বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তথ্য গ্রহণ করে। এর ক্ষতিকর প্রভাব অনুভবের পর বিভিন্ন দেশ কিছু নিয়ম ও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আমাদের দেশেও সমাজে একই ধরনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে, বিশেষ করে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে। সরকার ও প্রশাসনের এই বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। বিবেচনার অভাবে বিশ্বজুড়ে নতুন প্রজন্ম মাদকের শিকার হচ্ছে। মাদকাসক্তি একটি গুরুতর জাতীয় সমস্যা, এবং সরকার, প্রশাসন ও সমাজকে সময়মতো এর মোকাবিলায় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের অভিভাবকদের এই বিচক্ষণতা নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে হবে।
তিনি বলেন, নেপালে যে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে, যার ফলে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছে, তার মূলে কোথাও না কোথাও সমগ্র হিমালয় অঞ্চল জুড়ে (যা ভারত, তিব্বত, ভুটান, চিন-এর মতো একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত) চলা একমুখী উন্নয়নেরই ফলাফল রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়নের একটি সমগ্র ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা অত্যন্ত আবশ্যক।
আমাদের দেশের চেতনা হলো এই সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি, যা আজ ভারতের মানুষ-সহ সমগ্র বিশ্ব 'হিন্দু দৃষ্টিভঙ্গি' নামে চেনে। কোনও নির্দিষ্ট উপাসনা পদ্ধতি, নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা, কোনও সামাজিক বা রাজনৈতিক মতবাদ কিংবা কোন নির্দিষ্ট জাতি, ভাষা, প্রদেশের বাধ্যবাধকতা এর মধ্যে নেই। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ এই হিন্দু ভাবধারাকে জাগ্রত করে সমগ্র সমাজকে একটি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী সমাজে পরিণত করার জন্য কাজ করে চলেছে। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে বিশ্ব জীবন পর্যন্ত ধারণা, প্রতিষ্ঠা এবং সুরক্ষাও সামর্থ্য বা শক্তি ছাড়া সম্ভব নয়।সংগঠিত ও শক্তিশালী হিন্দু সমাজের কথা বলা বা তার জন্য কাজ করা সমস্ত মত ও পথের প্রতি শ্রদ্ধাভাব অথবা জাতির আবেগগত ঐক্যের বিরোধী নয়| হিন্দু সমাজের চিন্তাভাবনা ও স্বভাব অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার কারণে সংঘের কাজ আমাদের সকলের আবেগগত একাগ্রতা, সদিচ্ছা ও সদাচারের রূপকার হবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত এই স্বভাব ও সংস্কারই ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর-কে নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষের সুরক্ষার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার প্রেরণা দেয়।
সংঘের কাজের মূল ভিত্তি হলো শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেম। সংঘের কাজ স্বয়ংসেবকদের সমর্পণ এবং সেবা-পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সংঘের নিজের জন্য কিছুরই প্রয়োজন নেই। একটি সত্যকে ধারণ করে তার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য স্বয়ংসেবকরা পূর্ণ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের সঙ্গে লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কাজ করে যাবেন।
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌম্যজিৎ