গোয়া, ২৭ অক্টোবর (হি.স.): ২০২৭ সালের গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিটি বুথে পদ্ম ফোটানো এবং ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ার লক্ষ্য স্থির করল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। একই সঙ্গে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ফের সরকার গঠন এবং মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সাওয়ান্তের নেতৃত্বে ২০৩৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত গোয়া’ গড়ে তোলার সংকল্পের কথা জানালেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। মঙ্গলবার গোয়ার চিম্বলে দলের রাজ্য কার্যকারিণী বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এই লক্ষ্য তুলে ধরেন। পাশাপাশি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্র, তোষণনীতি এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে গণতন্ত্রকে দুর্বল করার অভিযোগও তোলেন তিনি।
নিতিন নবীন বলেন, গোয়ায় ফের সরকার গঠন করাই বিজেপির একমাত্র লক্ষ্য নয়। রাজ্যে উন্নয়নের যে গতি বজায় রয়েছে, তাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়ে গোয়াকে একটি উন্নত রাজ্যে পরিণত করাই দলের উদ্দেশ্য। বিধানসভা নির্বাচনে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ার লক্ষ্যে বুথস্তরে সংগঠনের সক্রিয়তা বাড়াতে তিনি কর্মীদের আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, বিজেপি কর্মীরা যত দিন উৎসাহ ও উদ্যম নিয়ে ময়দানে কাজ করবেন, তত দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব হবে না।
কংগ্রেসের সমালোচনা করে বিজেপি সভাপতি বলেন, যে দল সংবিধান ও গণতন্ত্রের কথা বলে, সেই কংগ্রেসই একসময় জরুরি অবস্থা জারি করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছিল। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেসের কাছে সংবিধানের প্রকৃত গুরুত্ব নেই। দলের একটি পরিবার নিজেদের সিদ্ধান্তকেই দেশের সংবিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। পরিবারতন্ত্র ও তোষণনীতিকে কেন্দ্র করেই কংগ্রেসের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
নিতিন নবীন বলেন, নির্বাচনে বিরোধীদের পক্ষে জনমত গেলে কংগ্রেস তাকে গণতন্ত্রের শক্তি বলে বর্ণনা করে। কিন্তু নির্বাচনে পরাজিত হলেই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে কংগ্রেসের সাম্প্রতিক প্রশ্ন তোলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাঁর অভিযোগ, সমস্যার সমাধান খোঁজার পরিবর্তে রাজনৈতিক ফায়দা তোলাই বিরোধী দলের উদ্দেশ্য।
তিনি জানান, দেশজুড়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ এবং ‘অরাজকতা দূর করো’ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দলের কর্মীরা সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে সরকারের কাজকর্ম এবং বিরোধীদের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করবেন।
লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সমালোচনা করে নিতিন নবীন অভিযোগ করেন, উন্নয়নের বিষয়গুলি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিবর্তে তিনি অরাজকতা ছড়ানো এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার রাজনীতি করছেন। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে আয়ুষ্মান ভারত, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা এবং কৃষক কল্যাণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগ মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনেছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার আওতায় চার কোটিরও বেশি দরিদ্র পরিবারকে বাড়ি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তাঁর দাবি, দেশে দুই লক্ষেরও বেশি স্টার্টআপ তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।
কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলির প্রসঙ্গ তুলে নিতিন নবীন অভিযোগ করেন, কর্নাটক ও হিমাচল প্রদেশে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হচ্ছে না। অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, বিহার, রাজস্থান ও গোয়ায় বিজেপি সরকারগুলি নিজেদের সংকল্প পূরণে কাজ করছে বলে দাবি করেন তিনি।
গোয়ার উন্নয়ন প্রসঙ্গে বিজেপি সভাপতি বলেন, ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ গোয়া’ কর্মসূচির মাধ্যমে আত্মনির্ভর ভারত গড়ার লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাজ্যের প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বাজেটের উল্লেখ করে তিনি জানান, বিজেপি সরকার পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং উত্তর ও দক্ষিণ গোয়ার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত করার জন্য কাজ করেছে।
মহিলাদের সম্মান ও জনজাতি সমাজের প্রসঙ্গেও রাহুল গান্ধীকে নিশানা
মহিলাদের অধিকার নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে নিতিন নবীন বলেন, মহিলাদের সম্মানের কথা বলা হলেও দলের এক সাংসদের বিরুদ্ধে মহিলাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে কংগ্রেস নেতারা নীরব কেন? জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগের প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। এই অভিযোগগুলির উল্লেখ করে তিনি কংগ্রেসের নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
গোয়ায় কুনবি শালের সম্মান ও মর্যাদার প্রসঙ্গেও রাহুল গান্ধীকে আক্রমণ করেন বিজেপি সভাপতি। তাঁর অভিযোগ, জনজাতি সমাজের সম্মানের প্রতীকগুলির গুরুত্ব বোঝেন না রাহুল গান্ধী। অসমে গামছা সংক্রান্ত একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনজাতি সমাজের সম্মানের কথা যাঁরা বলেন, তাঁদের উচিত সেই সমাজের ঐতিহ্য ও প্রতীকগুলিকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া।
নিতিন নবীন বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে মহিলাদের উন্নয়নের পাশাপাশি মহিলাদের নেতৃত্বাধীন উন্নয়নের উপরেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গোয়া সরকারের ‘গৃহ আধার যোজনা’ এবং ‘সুকন্যা কৌশল বিকাশ যোজনা’র মতো উদ্যোগ মহিলাদের ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখছে বলেও তিনি দাবি করেন।
বুথস্তরে সংগঠন মজবুত করার নির্দেশ
গোয়ায় দলের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে রাজ্যের ১,৭২১টি বুথে জনসংযোগ কর্মসূচি আয়োজনের আহ্বান জানান নিতিন নবীন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে কেন্দ্র, রাজ্য এবং বুথস্তরে সরকারের করা কাজের বিবরণ সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে কর্মীদের নির্দেশ দেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গোয়ার ৯৪ শতাংশ বুথে ইতিমধ্যেই ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছে। বাকি বুথগুলিতেও এই কর্মসূচি পৌঁছে দিয়ে শতভাগ বুথে তা নিশ্চিত করার জন্য কর্মীদের আহ্বান জানান তিনি। যুব, মহিলা, ওবিসি, কৃষক, তফসিলি জাতি এবং তফসিলি জনজাতি মোর্চাগুলিকে আগামী তিন-চার মাস ধারাবাহিকভাবে সক্রিয় রাখার নির্দেশও দেন। পাশাপাশি নতুন ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বিশেষ কর্মসূচি তৈরির কথা বলেন।
বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিতিন নবীন বলেন, এই দলে একজন সাধারণ কর্মীর পক্ষেও সর্বোচ্চ পদে পৌঁছনোর সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে চলা উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজের কথা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ২০২৭ সালের গোয়া বিধানসভা নির্বাচন ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যে ফের সরকার গঠন করে ‘বিকশিত গোয়া’ গড়ার সংকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই বিজেপির লক্ষ্য।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সাওয়ান্ত, রাজ্য বিজেপি সভাপতি দামোদর নায়েক, বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সংগঠন শিবপ্রকাশ, সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি তথা গোয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেত্রী ভারতী পাওয়ার, সহ-দায়িত্বপ্রাপ্ত অনিল অ্যান্টনি এবং রাজ্যসভার সাংসদ সদানন্দ তানাভড়ে-সহ দলের অন্যান্য নেতারা।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য