‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে দেশজুড়ে আন্দোলনের ডাক কংগ্রেসের
১ নভেম্বর বৃহত্তর সমাবেশের ঘোষণা দীপক মিশ্রের
কংগ্রেসের সাংবাদিক সম্মেলন


ধর্মনগর (ত্রিপুরা), ৩০ অক্টোবর (হি.স.) : ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং কথিত ভোট চুরির অভিযোগকে সামনে রেখে দেশজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দিল কংগ্রেস। ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানকে সামনে রেখে গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার দাবিতে এই আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ১ নভেম্বর কংগ্রেস ও বিরোধী ইন্ডি জোটের উদ্যোগে বৃহৎ সমাবেশেরও আয়োজন করা হবে। শুক্রবার ধর্মনগর জেলা কংগ্রেস ভবনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এই কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেন এআইসিসির পক্ষ থেকে উত্তর ত্রিপুরা ও ধলাই জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা দীপক মিশ্র।

শুক্রবার সকাল ১১টা নাগাদ অনুষ্ঠিত এই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ধর্মনগর জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি নিরূপণ দে, ইন্দ্রজিৎ পাল, চয়ন ভট্টাচার্য-সহ দলের অন্যান্য নেতৃত্ব ও কর্মীরা। অনুষ্ঠানের শুরুতে উত্তরীয় ও পুষ্পস্তবক দিয়ে দীপক মিশ্রকে স্বাগত জানান জেলা কংগ্রেস সভাপতি নিরূপণ দে। এরপর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দেশের বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থা, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন তিনি।

দীপক মিশ্রের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক সাধারণ নাগরিকের নাম বাদ পড়ছে। এর ফলে প্রকৃত ও যোগ্য ভোটারদের সাংবিধানিক ভোটাধিকার বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটাধিকার নাগরিকের অন্যতম মৌলিক শক্তি। অথচ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের অভিযোগের পরও নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে কমিশনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কংগ্রেস নেতার আরও অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের আড়ালে এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে বিরোধী দলগুলির রাজনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি শাসক দল বিজেপি সুবিধা পেতে পারে। যদিও এই অভিযোগগুলির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা হয়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে স্পষ্ট জবাবদিহি দাবি করেন তিনি। তাঁর কথায়, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে কোনও যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া চলবে না।

সাংবাদিক সম্মেলনে দীপক মিশ্র জানান, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ইতিমধ্যেই ভোটারদের অধিকার রক্ষার দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী ১ নভেম্বর এই আন্দোলন আরও বৃহত্তর রূপ পাবে। ওই দিন কংগ্রেস ও ইন্ডিয়া জোটের উদ্যোগে একটি বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে কেন্দ্র সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা এবং নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে বিরোধী দলগুলি ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে নামবে বলেও জানান তিনি।

এই ইস্যুতে আইনি ও সাংবিধানিক লড়াইয়ের কথাও তুলে ধরেন মিশ্র। তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও যোগাযোগ করার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থা বজায় রাখতে হলে নির্বাচন কমিশনকে প্রতিটি অভিযোগের যথাযথ জবাব দিতে হবে। গণতন্ত্রের স্বার্থে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষ করে ত্রিপুরায় আসন্ন ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এআইসিসির এই নেতা। তিনি জানান, আগামী ৬ নভেম্বর থেকে রাজ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় যাতে কোনও প্রকৃত ভোটারের নাম ভুলবশত বাদ না যায়, সে বিষয়ে আগাম সতর্কতা অবলম্বনের দাবি জানান তিনি। তাঁর আশঙ্কা, যথাযথ যাচাই ও স্বচ্ছতা বজায় না থাকলে বহু যোগ্য ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে মহারাষ্ট্র ও পশ্চিমবঙ্গের পরিসংখ্যান তুলে ধরে দীপক মিশ্র দাবি করেন, মহারাষ্ট্রে প্রায় ৩৯ লক্ষ এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়ার কারণ কী, কোন পদ্ধতিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ভোটারদের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাবদিহি দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধন একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হলেও তার আড়ালে যেন কোনও নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ণ না হয়।

আগামী ১ নভেম্বরের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজ্যে রেল পরিষেবা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন দীপক মিশ্র। তাঁর দাবি, ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে সমস্ত বাধা উপেক্ষা করেই কংগ্রেস ও ইন্ডি জোট তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলে স্পষ্ট করেন তিনি।

দীপক মিশ্রের কথায়, এই লড়াই কোনও একটি রাজনৈতিক দলের স্বার্থরক্ষার লড়াই নয়; বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার, সংবিধানের মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার লড়াই। তাই দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষকে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সাংবাদিক সম্মেলন শেষে ধর্মনগর জেলা কংগ্রেসের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সাংগঠনিক বৈঠকে মিলিত হন দীপক মিশ্র। বৈঠকে দলের বর্তমান সাংগঠনিক পরিস্থিতি, আগামী দিনের কর্মসূচি এবং উত্তর ত্রিপুরা ও ধলাই জেলায় কংগ্রেসের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। সব মিলিয়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে সামনে রেখে ত্রিপুরাতেও রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিল কংগ্রেসের এই সাংবাদিক সম্মেলন।

হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ




 

 rajesh pande