( রাউন্ড আপ) বঙ্গ নির্বাচন ২০২৬: শাহের ‘চার্জশিট’ বনাম মমতার ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব, পুলিশ পর্যবেক্ষক বদলে চড়ল উত্তাপ
কলকাতা, ২৮ মার্চ (হি.স.): ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আঙিনা এখন রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছে। একদিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের তীক্ষ্ণ অভিযোগ সম্বলিত ‘চার্জশিট’, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা
অমিত শাহ মমতা


কলকাতা, ২৮ মার্চ (হি.স.): ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আঙিনা এখন রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছে। একদিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের তীক্ষ্ণ অভিযোগ সম্বলিত ‘চার্জশিট’, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বহিরাগত প্রভাব’ ও ‘নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্ব’ নিয়ে পাল্টা তোপ—সব মিলিয়ে শনিবার দিনভর উত্তপ্ত থাকল রাজ্য রাজনীতি। এর মাঝেই কমিশনের পক্ষ থেকে ৫ জন পুলিশ পর্যবেক্ষককে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্তরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

শনিবার কলকাতায় এক জনসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘ ‘অভিযোগপত্র’ বা ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করেন। শাহের মতে, এই চার্জশিট কোনও রাজনৈতিক নথি নয়, বরং বাংলার নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণার দলিল। তিনি অভিযোগ করেন যে, রাজ্যে গত দেড় দশকে কেবল ভয়, দুর্নীতি এবং তোষণের সংস্কৃতি শিকড় গেড়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি নিশানা করে শাহ বলেন, “মমতা দিদি সবসময় সহানুভূতির কার্ড খেলেন। কখনও চোট পাওয়ার ঘটনা, কখনও মাথায় ব্যান্ডেজ বা অসুস্থতার বাহানা—এই সবই তাঁর রাজনৈতিক কৌশল যাতে মানুষের সহানুভূতি পাওয়া যায়। কিন্তু মানুষ এখন আসল সত্যিটা জেনে গিয়েছে।” তিনি আরও দাবি করেন যে, রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে এবং অনুপ্রবেশ জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাহ পরিসংখ্যান দিয়ে দেখান যে, ২০১৪ থেকে আজ পর্যন্ত বিজেপির জনভিত্তি ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অমিত শাহের আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতে মুখ্যমন্ত্রী বেছে নেন পশ্চিম বর্ধমানের শিল্পাঞ্চলকে। রানিগঞ্জ ও অন্ডালের জনসভা থেকে তিনি সরাসরি কেন্দ্র এবং নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ না করে বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে চলছে। মমতা বলেন, “যারা এলাকার রাস্তাঘাট ও পরিস্থিতি চেনেন, সেই সমস্ত দক্ষ অফিসারদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বদলি করা হচ্ছে। এটা আসলে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার এক গভীর ষড়যন্ত্র।”

রানিগঞ্জের ধসপ্রবণ এলাকার মানুষের জন্য বড়সড় পুনর্বাসন প্যাকেজ ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার নিরাপদ আবাসন ও ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সাহায্য দেবে। পাশাপাশি তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলায় বুলডোজার সংস্কৃতি শুরু হবে এবং সাধারণ মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হবে।” জামুড়িয়ার প্রার্থীর ছেলের ‘লালবাতি’ ব্যবহারের বিষয় নিয়ে প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে সতর্ক করে তিনি বুঝিয়ে দেন যে, দলীয় কোনও বিচ্যুতি তিনি বরদাস্ত করবেন না।

রাজনৈতিক বাকযুদ্ধের আবহে নির্বাচন কমিশন শনিবার এক বড় প্রশাসনিক রদবদল ঘটিয়েছে। মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং পশ্চিম মেদিনীপুর সহ বেশ কিছু সংবেদনশীল এলাকার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ৫ জন পুলিশ পর্যবেক্ষককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে বিহার ক্যাডারের আইপিএস জয়ন্ত কান্তের অপসারণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, জনৈক আধিকারিকের সাথে বিহারের এক প্রভাবশালী বিজেপি নেতার পারিবারিক যোগসূত্র রয়েছে। এই অভিযোগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কমিশন তাঁকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় আইপিএস হৃদয় কান্তকে দায়িত্ব দেয়। কমিশনের এই তৎপরতা একদিকে যেমন নিরপেক্ষতার বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে শাসকদলের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে কেন বারবার আধিকারিক বদল করে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনে ভোট হবে দুটি পর্যায়ে— ২৩ এপ্রিল এবং ২৯ এপ্রিল। ৪ মে ফলাফল ঘোষণার মাধ্যমে পরিষ্কার হবে বাংলার মানুষ শাহের ‘ভরসা’র আহ্বানে সাড়া দেবেন নাকি মমতার ‘উন্নয়ন ও লড়াই’-এ আস্থা রাখবেন।

অমিত শাহের দাবি অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশ বা অসমের মতো ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারই বাংলার অন্ধকার ঘুচিয়ে শিল্পায়ন ও নিরাপত্তা ফেরাতে পারে। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাল্টা যুক্তি—বাংলাকে বাইরে থেকে আসা শক্তির হাতে তুলে দিলে বাংলার সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। সব মিলিয়ে, শনিবারের এই রাজনৈতিক সংঘাত বুঝিয়ে দিল যে আগামী কয়েক সপ্তাহ বাংলার আকাশে রাজনীতির মেঘ আরও ঘনীভূত হবে।

হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি




 

 rajesh pande