
সৌম্যজিৎ চক্রবর্তী
চাকুলিয়া, ২২ মে (হি.স.): ঊষাকালের ব্রাহ্মমুহূর্তে যখন প্রথম সূর্যের আলো স্পর্শ করছে ধরিত্রীকে, ঘুম ভাঙছে জীবজগতের; ঠিক সেসময় প্রত্যুষের সূচনালগ্ন থেকেই ঝাড়খণ্ডের চাকুলিয়ার গোশালায় রীতিমতো ব্যস্ততার ছবি। কোথাও গোবর দিয়ে তৈরি হচ্ছে জৈব সার, কোথাওবা গোমূত্র থেকে সযত্নে উৎপাদন করা হচ্ছে ভেষজ ওষুধ। আদতে এটি সাধারণ কোনও গোশালা নয়; বলা ভাল, দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ভোলবদলের স্বপ্নের আঁতুরঘর। যে স্বপ্ন ভারতকে আবার তার শিকড়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার, যে স্বপ্ন দেশের মাটিকে রাসায়নিক সারের ক্ষত থেকে মুক্ত করার, যে স্বপ্ন গ্রামের যুবকদের ঘরের কাছেই কর্মসংস্থানের সুযোগ এনে দেওয়ার। গোসেবা পরিবার-এর হাত ধরে চাকুলিয়ায় নীরবে ঘটে চলেছে এমনই এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লব। যার মূল চালিকাশক্তি— আমাদের সনাতন সংস্কৃতির ধাত্রী 'গোমাতা'।
সাধারণত 'গোশালা' বললেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে অনুদানের ওপর নির্ভরশীল কিছু রুগ্ন ও বৃদ্ধ গবাদি জীবের আশ্রয়স্থল। কিন্তু চাকুলিয়ায় গোসেবা পরিবার-এর বিনামূল্যের আবাসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি সেই চেনা ধারণাটাকে এক ঝটকায় বদলে দিতে শুরু করেছে। লক্ষ্য একটাই— গোশালাগুলিকে যেন অন্যের অনুদানের মুখাপেক্ষী না থেকে নিজেই একেকটি লাভজনক উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। হয়ে উঠতে পারে কর্মসংস্থানের কেন্দ্র।
এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা যুবকদের শেখানো হচ্ছে— কীভাবে গোবর ও গোমূত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা যায় একটি স্বাবলম্বী অর্থনীতি। বিনামূল্যে চলা এই বিশেষ আবাসিক শিবিরে শেখানো হচ্ছে, গোবর ও গোমূত্র শুধুমাত্র কোনও বর্জ্য নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির আসল মেরুদণ্ড। এগুলো থেকে তৈরি জৈব সার, কীটনাশক, বায়োগ্যাস এবং নানা ধরনের ভেষজ প্রসাধন সামগ্রী আজ বাজারের নতুন ট্রেন্ড।
এই অভিযানের উদ্যোক্তারা মনে করেন, ভারতের উন্নয়নের আসল চাবিকাঠি নিহিত আছে গ্রামেগঞ্জে। আর সেই গ্রামকে স্বনির্ভর করতে গোসেবা পরিবার পাঁচটি মূল বিষয়ের ওপর কাজ করছে:
প্রথমত, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে জমির উর্বরতা ফেরানো, যাতে কৃষকের খরচের বোঝা কমে। দ্বিতীয়ত, আয়ুর্বেদ ও পঞ্চগব্যর মেলবন্ধনে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা। তৃতীয়ত, গোবর গ্যাসের মাধ্যমে গ্রামেগঞ্জে জ্বালানিতে আত্মনির্ভরতা। চতুর্থত, গোবর ও গোমূত্র থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি। পঞ্চমত, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবাদি পশু পালন ও গো-ঔষধের প্রচার।
দেশের প্রায় ২০ হাজার গোশালা রয়েছে। প্রতিটি গোশালা যদি আশেপাশের ৩০টি গ্রামের দায়িত্ব নেয়, তাহলে বদলে যেতে পারে দেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাঠামো। ভারতের প্রায় সমস্ত গ্রাম আত্মনির্ভরশীলতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। এমনই মত এই ভাবনার কান্ডারী গোসেবা পরিবার-এর।
নিজের গ্রামে যখন কর্মসংস্থানের অভাবে গ্রামের যুবসমাজ পাড়ি জমায় ভিন রাজ্যে, অচেনা শহরে; সেইসময় গোসেবা পরিবার-এর এই উদ্যোগ তাদের ডাক দিচ্ছে ঘরে ফেরার। এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষিত যুবকরা দেশের বিভিন্ন গ্রামের গোশালায় কর্মী হিসেবে নিযুক্ত হতে পারে। সেবাভাবের পাশাপাশি এই কাজের ভিত্তিতে যোগ্যতা এবং দক্ষতার উপর নির্ভর করে মিলতে পারে ১৫ থেকে ২৫ হাজার পর্যন্ত সাম্মানিক। সেবার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখায় এই প্রচারাভিযান। এমনটাই মত উদ্যোক্তাদের।
চাকুলিয়ার এই মডেল এখন দেশের সমস্ত গোশালার কাছে প্রসারিত করতে প্রস্তুত গোসেবা পরিবার। কোনও গোশালা যদি নিজেদের স্বাবলম্বী করতে চায়, তাহলে গোসেবা পরিবার তাদের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে এই সংস্থা। সরাসরি এখান থেকে প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠিয়ে অন্যান্য গোশালাগুলিকে স্বনির্ভর করতে উদ্যোগী হবে গোসেবা পরিবার।
গোসেবা পরিবার-এর এই উদ্যোগ শুধুমাত্র গোপালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই গল্প এক আত্মবিশ্বাসী ভারতের, যা তার গ্রামীণ ঐতিহ্যকে বিজ্ঞানভিত্তিক পথের মাধ্যমে এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে। গোমাতা কেবল আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়েই নয়, বরং বাস্তবে হয়ে উঠছে 'আত্মনির্ভর ভারত'-এর দৃঢ় ভিত্তি।
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌম্যজিৎ