
গুয়াহাটি, ২৬ জুন (হি.স.) : অম্বুবাচি তিথি তথা অম্বুবাচি উপলক্ষে মেলায় মা কামাখ্যা ধাম ভরে উঠেছে ভিন্নবেশধারী সাধু-সন্ন্যাসী ও বাবায়। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত সাধুদের উপস্থিতিতে নীলাচল পাহাড়ে সৃষ্টি হয় এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশ। দুর্গম অঞ্চলে তপস্যারত নাগা বাবা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন আশ্রম, মঠ ও মন্দিরের সন্ন্যাসীরা সমবেত হয়েছেন কামাখ্যায়।
ভারতের চারটি প্রধান শক্তিপীঠের অন্যতম জাগ্রত শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিত কামাখ্যা ধাম। প্রচলিত বিশ্বাস, এখানে মা কামাখ্যার আরাধনা করলে যোগী, সাধু ও সন্ন্যাসীরা আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করেন। সে জন্য, বিশেষ করে অম্বুবাচির সময় তাঁরা এখানে এসে তন্ত্রসাধনা, জপ, ধ্যান ও পূজায় অংশ নেন।
হাজার বছরের ঐতিহ্য ও কিংবদন্তিতে সমৃদ্ধ এই শক্তিপীঠে লক্ষ সক্ষ ভক্তের পাশাপাশি নজর কেড়েছেন বিভিন্ন বেশভূষার বাবারা। পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুর থেকে এসেছেন শ্রীমহন্ত রঞ্জিতানন্দ গিরি মহারাজ। তিনি ‘চকোলেট বাবা’ নামে পরিচিত। তাঁর কাছে আশীর্বাদ নিতে এলে তিনি ভক্তদের চকোলেট বিতরণ করেন। এছাড়া এসেছেন ‘তাস বাবা’ নামে পরিচিত মণ্ডল শ্রীমহন্ত নির্মলানন্দ গিরি মহারাজ, মণ্ডল শ্রীমহন্ত রবীন্দ্রানন্দ গিরিজি মহারাজ তারাপীঠ থেকে শ্রীমহন্ত উমাশঙ্কর পুরীজি মহারাজ সহ বহুজন।
শ্রী পঞ্চদশনাম জুনা আখড়া সহ মোট ১৩টি আখড়ার সাধু-সন্ন্যাসীরা এ বছর কামাখ্যায় সমবেত হয়েছেন। নাগা সাধুদের সাতটি আখড়ার প্রতিনিধিরাও এসে তাবু খাটিয়ে বিনিদ্ৰ ধ্যানে মগ্ন হয়েছেন। তাঁদের আগমনে নীলাচলে আরও গাঢ় হয়েছে আধ্যাত্মিক আবহ।
এবারের অম্বুবাচিতে আগত সাধুর জীবনযাপন বিশেষভাবে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এক সাধু গত ১৬ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ডান হাত উঁচু করে রেখেছেন। আরেকজন সাধু ১২ বছরের ব্রত নিয়েছেন মাটিতে পা না রাখার। তিনি একটি কাঠের দোলনায় ঝুলে জীবনযাপন করেন।
তবে এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত সাধু হলেন ‘ডলার বাবা’। তাঁর প্রকৃত নাম শ্রীমহন্ত তন্ত্র সম্রাট রজনীশ মুনিজি। তিনি ভক্তদের কাছ থেকে কখনও দান চান না। কেউ তাঁর সেবা করলে আশীর্বাদ দেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেক ভক্তকে একটি করে মার্কিন ডলার উপহার দেন। তবে অজ্ঞাতে কেউ কোনও দান রেখে গেলে তিনি তা গ্রহণ করেন।
অম্বুবাচি উপলক্ষ্যে নীলাচল পাহাড় এখন ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসী এবং পূজারীদের পদচারণায় মুখর। ঘণ্টা ও শঙ্খধ্বনির মধ্যে তন্ত্র-মন্ত্র, জপ ও ধ্যানের পরিবেশে কামাখ্যা ধাম যেন এক অন্য রূপ ধারণ করেছে। জুনা আখড়া সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধুদের উপস্থিতিতে অনেকে এই সমাবেশকে ‘দ্বিতীয় কুম্ভমেলা’র সঙ্গেও তুলনা করছেন।
বিশ্বাস করা হয়, অম্বুবাচির সময় মা কামাখ্যার আরাধনা করলে ভক্তদের মনোবাসনা পূর্ণ হয় এবং সাধু-সন্ন্যাসীরা আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করেন। এই বিশ্বাসেই দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ কামাখ্যায় সমবেত হয়েছেন।
এবারের মেলায় নিউজিল্যান্ড থেকেও এক বিদেশি ভক্ত এসেছেন। চার বছর আগে প্রথমবার কামাখ্যায় এসে তিনি যে আধ্যাত্মিক অনুভূতি লাভ করেছেন, সেই টানেই আবার ফিরে এসেছেন। তিনি শুধু বিভিন্ন সাধু-সন্ন্যাসীর সঙ্গে মতবিনিময়ই করেননি, কিছু মন্ত্রও শিখেছেন, জানান তিনি নিজে।
এছাড়া রাজস্থান থেকে আগত সন্ন্যাসিনী ‘মা ভবানী’-ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। অম্বুবাচি উপলক্ষযে কামরূপ মহানগর জেলা প্রশাসন ও কামাখ্যা মন্দির পরিচালন সমিতি ভক্তদের সুবিধার্থে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মন্দিরের প্ৰদান দলৈ কবীন্দ্রপ্রসাদ শর্মা মেলায় আগত ভক্তদের শৃঙ্খলা বজায় রেখে ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস