
কলকাতা, ১৭ জুলাই (হি. স.) : অবসান হলো ক্রিকেটের এক সোনালী যুগের। প্রয়াত হলেন ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার স্যার গ্যারফিল্ড (গ্যারি) সোবার্স। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁর প্রয়াণের খবর আসতেই গভীর শোকে নিমজ্জিত হয়েছে গোটা ক্রীড়াজগৎ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। আর মাত্র দুই সপ্তাহ পরেই তাঁর ৯০তম জন্মদিন উদযাপন করার কথা ছিল অনুরাগীদের, কিন্তু তার আগেই চিরবিদায় নিলেন এই মহাতারকা।
ক্রিকেট মাঠে ব্যাট ও বল হাতে স্যার গ্যারি সোবার্স যে অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়ে গিয়েছেন, তা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অমলিন থাকবে। ক্রিকেট বিশ্বের কিংবদন্তি স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান সোবার্সকে ‘ফাইভ ইন ওয়ান’ ক্রিকেটার হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে বিধ্বংসী ব্যাটার, অন্য দিকে বল হাতেও ছিলেন সমান পারদর্শী। ইনিংসের শুরুতে যেমন নতুন বলে মিডিয়াম পেস বোলিং করে প্রতিপক্ষকে কাঁপিয়ে দিতেন, তেমনই বল পুরনো হলে হয়ে উঠতেন চমৎকার চায়নাম্যান (বাঁ-হাতি স্পিন) বোলার। এর পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও তাঁর ক্ষিপ্রতা ছিল বিদ্যুতের মতো। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানের ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি যুগেও যদি সোবার্স খেলতেন, তবে এই সংক্ষিপ্ত সংস্করণেও তিনি একইভাবে অপ্রতিোধ্য ও ত্রাস হয়ে উঠতেন। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তিনিই প্রথম ব্যাটার, যিনি এক ওভারে ছয়টি ছক্কা হাঁকানোর ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছিলেন।
১৯৫৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে স্যার গ্যারি সোবার্সের অভিষেক হয়। নিজের সহজাত প্রতিভার জোরে ১৯৫৪ সালেই শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলে সুযোগ করে নেন এই ক্যারিবিয়ান কিশোর। এরপর ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি তাঁর টেস্ট জীবনের প্রথম শতরানটি করেন। তবে শুধু শতরানেই থামেননি তিনি, সেই ইনিংসে ৩৬৫ রানে অপরাজিত থেকে স্যার লেন হাটনের রেকর্ড ভেঙে দেন। এটি দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এক ইনিংসে কোনো ব্যাটারের করা সর্বোচ্চ রান হিসেবে অক্ষুণ্ণ ছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে সোবার্সেরই স্বদেশীয় ব্রায়ান লারা এই রেকর্ড ভাঙেন।
নিজের কেরিয়ারে মোট ৯৩টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ৫৭.৭৮ গড়ে ৮,০৩২ রান করেছেন সোবার্স, যার মধ্যে রয়েছে ২৬টি শতরান। পাশাপাশি বল হাতে নিয়েছেন ২৩াসটি উইকেট এবং ফিল্ডার হিসেবে তালুবন্দি করেছেন ১০৯টি ক্যাচ। শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে তাঁর মতো অলৌকিক প্রতিভাকে মাপা অসম্ভব। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এক ‘মসিহা’ বা ত্রাতার সমতুল্য। অধিনায়ক হিসেবেও বহু নতুন ক্রিকেটারকে তুলে এনেছেন তিনি। তাঁর ক্রিকেটীয় দূরদর্শিতাও ছিল প্রবাদপ্রতিম। ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ শুরুর আগেই এই জহুরি চিনেছিলেন ভারতীয় দলকে এবং কপিল দেবের নেতৃত্বাধীন সেই দলটিকে প্রতিযোগিতার ‘ডার্ক হর্স’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
স্যার গ্যারি সোবার্সের প্রয়াণে বিশ্ব ক্রিকেটের একটি মহীরুহের পতন ঘটল। শরীরীভাবে তিনি চলে গেলেও, যতদিন ক্রিকেট খেলা বেঁচে থাকবে, ততদিন তাঁর নাম ও কীর্তি প্রতিটি ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি