খামেনেইর শেষকৃত্যে যোগ দেবেন কি মোজতবা! জল্পনার মাঝেই ইরানে নজিরবিহীন প্রস্তুতি
তেহরান, ৩ জুলাই (হি.স.) : প্রয়াত নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইর শেষকৃত্যকে ঘিরে নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়েছে ইরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হওয়া খামেনেইকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ইরান ও ইরাকজুড়ে সপ্তাহব
খামেনেইর শেষকৃত্যে যোগ দেবেন কি মোজতবা! জল্পনার মাঝেই ইরানে নজিরবিহীন প্রস্তুতি


তেহরান, ৩ জুলাই (হি.স.) : প্রয়াত নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইর শেষকৃত্যকে ঘিরে নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়েছে ইরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হওয়া খামেনেইকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ইরান ও ইরাকজুড়ে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। তবে এই বিশাল আয়োজনের মধ্যেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, খামেনেইর ছেলে ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি মোজতবা খামেনেই শেষকৃত্যে প্রকাশ্যে উপস্থিত হবেন কি না। হামলার পর থেকে তিনি আর জনসমক্ষে আসেননি।

জানা গেছে , খামেনেইর স্মরণে আয়োজিত এই কর্মসূচি শুধু ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বকে, বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে একটি কড়া রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে এই শেষকৃত্যে। কর্মসূচির সময়ও এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে তা যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের সঙ্গে মিলে যায়।

ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, ইসলামিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পর এটিই হতে চলেছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য। ইরান ও ইরাকের একাধিক শহর এবং শিয়া মুসলিমদের পবিত্র তীর্থস্থানে খামেনেইর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে। বৃহস্পতিবার ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, আমাদের দেশের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্প বিশ্বকে জানাতে হবে। ইরানের জনগণ অন্যায়ের সামনে মাথা নত করবে না এবং খামেনেইর রক্তের প্রতিশোধ না নিয়ে থামবে না।

২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় মোজতবা খামেনেইও গুরুতর আহত হন। তারপর থেকেই তাঁকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে অজ্ঞাত স্থানে রাখা হয়েছে। ফলে অনেকেরই ধারণা, বাবার শেষকৃত্যই হতে পারে তাঁর প্রথম প্রকাশ্য উপস্থিতির মঞ্চ। তবে এখনও পর্যন্ত তাঁর অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া নিয়ে কোনও সরকারি‍ভাবে নিশ্চয়তা নেই। হামলার পর থেকে তিনি কেবল লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। এমনকি নিজের স্ত্রীর বিদায় সভাতেও তিনি উপস্থিত হননি।

খামেনেইর মরদেহ মার্কিন স্বাধীনতা দিবসের দিন সাধারণ মানুষের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হবে। আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র নন-রেসিডেন্ট ফেলো সিনা তুসির মতে, হত্যাকাণ্ডের পর খামেনেইর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতীকী গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তাঁকে এখন শিয়া সম্প্রদায়ের শহিদ নেতাদের পর্যায়ে তুলে ধরা হচ্ছে।

ইরানের ইতিহাসে এর আগে শুধু দু'বার এত বড় শেষকৃত্যের আয়োজন হয়েছিল। ১৯৮৯ সালে ইসলামিক রিপাবলিকের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতোল্লা রুহোল্লাহ খোমেনির এবং ২০২০ সালে কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানির শেষযাত্রায় বিপুল জনসমাগম হয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রেই পদপিষ্ট হয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

সরকারি কর্মসূচি অনুযায়ী, শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টা থেকে তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় খামেনেইর মরদেহ জনসাধারণের শেষ শ্রদ্ধার জন্য রাখা হবে। এরপর রাজধানীর পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত বিশাল শোকযাত্রা বের হবে। সেখান থেকে মরদেহ কোয়মে নিয়ে যাওয়া হবে। পরে বিমানযোগে ইরাকের নাজাফ ও কারবালা সফরের পর শেষ পর্যন্ত মাশহাদের ইমাম রেজা দরগাহ প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাধিস্থ করা হবে। মাশহাদই খামেনেইর জন্মস্থান।

শেষকৃত্য উপলক্ষে তেহরানের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে। যেসব শহর দিয়ে শোকযাত্রা যাবে, সেখানে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রাজধানী তেহরানে ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা কার্যকর করা হবে।

নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য ২,৫০০টি অ্যাম্বুল্যান্স, ২১টি হেলিকপ্টার, ১০০টি ড্রোন এবং হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে দুই ডজনেরও বেশি হাসপাতাল, পাঁচ লক্ষ লিটার আইভি ফ্লুইড এবং ২০ হাজার শ্রেণিকক্ষ। বেসিজ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী জানিয়েছে, শোকযাত্রীদের জন্য পাঁচ কোটি রুটি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তেহরান, কোয়ম ও মাশহাদে আগত দর্শনার্থীদের নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সরকার।

ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমান, শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে ৪০ লক্ষ থেকে দেড় কোটিরও বেশি মানুষ অংশ নিতে পারেন। ইরাকে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে ইসলামিক রিপাবলিকের সীমান্তের বাইরেও নিজেদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাবের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে, শেষকৃত্য ঘিরে যে কোনও ধরনের নাশকতা রুখতে কড়া সতর্কতা জারি করেছে ইরানের সেনাবাহিনী। বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, দেশের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের হুমকি তৈরি হলে তেহরান তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব দেবে। তাঁর এই মন্তব্য আসে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজের সেই দাবির পর, যেখানে তিনি মোজতবা খামেনেইকে হত্যার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছিলেন।

এই পরিস্থিতিতে শেষকৃত্যে মোজতবা খামেনেইর সম্ভাব্য উপস্থিতি এখন আন্তর্জাতিক মহলেরও অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। তিনি প্রকাশ্যে এলে সেটিই হবে হামলার পর তাঁর প্রথম জনসমক্ষে আবির্ভাব।

---------------

হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য




 

 rajesh pande