
দুর্গাপুর, ৮ জুলাই (হি.স.): বিভিন্ন শিল্প কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে তোলাবাজি, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সামগ্রী আত্মসাতের অভিযোগে কাঁকসার গোপালপুরে তীব্র জনরোষের মুখে পড়লেন প্রাক্তন মন্ত্রী-ঘনিষ্ঠ এক তৃণমূল শ্রমিক নেতা। বুধবার তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে গণধোলাই দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। একইসঙ্গে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ অনুগামীকেও মারধর করা হয়। উত্তেজিত জনতা তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের একটি দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে বিশ্ববাংলা লোগোযুক্ত ত্রিপল, সরকারি মাছের খাবার এবং ব্লিচিং পাউডার উদ্ধার করেছে বলে দাবি করে। ঘটনাকে ঘিরে গোটা এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নামে কাঁকসা থানার পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী।
অভিযোগ, অভিযুক্ত তৃণমূল শ্রমিক নেতা শিবদাস মণ্ডল ওরফে বেবোর মূল বাড়ি দুর্গাপুরের বিরভানপুরে। প্রায় ২০ বছর আগে তিনি কাঁকসার গোপালপুর পশ্চিমপাড়ায় মামারবাড়িতে এসে বসবাস শুরু করেন। প্রথমদিকে এক সিপিএম নেতার অফিস-বেয়ারা হিসেবে কাজ করতেন। পরে ওই নেতার উদ্যোগেই বামুনাড়া শিল্পতালুকের একটি বেসরকারি কারখানায় নৈশপ্রহরীর চাকরি পান।
স্থানীয়দের দাবি, ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই শিবদাস মণ্ডলের উত্থান শুরু হয়। প্রায় এক দশক আগে তিনি রাজ্যের এক প্রাক্তন পঞ্চায়েত মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। এরপর থেকেই বামুনাড়া শিল্পতালুকের একাধিক কারখানায় তোলাবাজি, টাকার বিনিময়ে বহিরাগত শ্রমিক নিয়োগ এবং ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠতে থাকে। পরে তিনি নিজেই ঠিকাদারি ব্যবসায় নামেন। অভিযোগ, বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের বখরা আদায় করা হত। এমনকি শ্রমিকদের বোনাসের টাকা তুলে আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সরকারি প্রকল্পের সুযোগ নিয়ে গোপালপুরে তিনি একটি বিলাসবহুল বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন। সেখানে তৎকালীন শাসকদলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রীর যাতায়াত ছিল। গত কয়েক বছরে অফিস-বেয়ারা থেকে তিনি বামুনাড়া শিল্পাঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন। প্রায় এক বছর আগে বিরভানপুরে নিজের জমিতে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিলাসবহুল বাড়িও নির্মাণ করেন বলে অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর ইঙ্গিতেই বিভিন্ন কারখানায় ঠিকাদারদের কাজের বরাত দেওয়া হত। কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে বহু মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি স্থানীয়দের। নির্ধারিত বখরা না দিলে ঠিকাদারদের কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হত বলে অভিযোগ। প্রভাব খাটিয়ে গ্রামের রাস্তার মাঝখানে বোরিং করে সাবমার্সিবল পাম্প বসানোর ঘটনাতেও তাঁর নাম জড়িয়েছে। নির্বাচনের আগে একটি পুকুর ভরাট করে দলীয় কার্যালয় নির্মাণের অভিযোগও ওঠে। এছাড়া তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন যানবাহন থেকে নিয়মিত তোলা আদায় করতেন বলেও অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পুলিশও তাঁর বা তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পেত না। তবে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন। সম্প্রতি এলাকায় ফিরে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন প্রতারিত ও বঞ্চিত মানুষ।
বুধবার সকালে পশ্চিমপাড়ায় তাঁর বাড়ি ঘেরাও করেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় কাঁকসা থানার পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। অভিযোগ, শিবদাস মণ্ডল বাড়ি থেকে বেরোতেই তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয় এবং পরে গণধোলাই শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।
এরপর বিক্ষুব্ধ জনতা তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মানস দত্ত নামে এক তৃণমূল কর্মীর বাড়ির সামনে অবস্থান বিক্ষোভে বসে। অভিযোগ, মানস দত্ত বাইরে বেরোতেই তাকেও মারধর করা হয়।
একই সময়ে শিবদাস মণ্ডলের দখলে থাকা তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের একটি দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে জনতা। সেখান থেকে বিশ্ববাংলা লোগোযুক্ত প্রায় ২০০-র বেশি সরকারি ত্রিপল, বস্তা বস্তা সরকারি মাছের খাবার এবং সরকারি ব্লিচিং পাউডার উদ্ধার হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
স্থানীয় বিজেপি নেতা সংগ্রাম মুখোপাধ্যায় অভিযোগ করে বলেন, এই শিবদাস মণ্ডল শুধু ত্রিপল নয়, সরকারি বহু সম্পত্তি লুট করেছে। আজ সেই সব একে একে দলীয় কার্যালয় থেকে বেরিয়ে আসছে। আমরা পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি। এরা পা থেকে মাথা পর্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত। এদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে কাঁকসা থানার পুলিশ।
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা