অসমের আরও এক সাংস্কৃতিক দূতের প্রয়াণ, চলে গেলেন সমৃদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীত ও প্রখ্যাত বেহালাবাদক মিনতি খাউন্দ
গুয়াহাটি, ১৯ জানুয়ারি (হি.স.) : অসম হরিয়েছে আরও এক শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক দূত প্রখ্যাত বেহালাবাদক, সমৃদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীত জগতের অন্যতম নক্ষত্র মিনতি খাউন্দ। গতকাল রবিবার সন্ধ্যারাত ৬টা ৪০ মিনিটে গুয়াহাটির একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছেন মিনতি।
মিনতি খাউন্দ (ফাইল ফটো)


গুয়াহাটি, ১৯ জানুয়ারি (হি.স.) : অসম হরিয়েছে আরও এক শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক দূত প্রখ্যাত বেহালাবাদক, সমৃদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীত জগতের অন্যতম নক্ষত্র মিনতি খাউন্দ। গতকাল রবিবার সন্ধ্যারাত ৬টা ৪০ মিনিটে গুয়াহাটির একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছেন মিনতি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

মিনতি খাউন্দের প্রয়াণে অসম সহ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত জগৎ শোকস্তব্ধ। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের এক মহীরুহের প্রয়াণ একটি যুগের অবসান ঘটিয়েছে। পাঁচ দশকের বেশি সময়জুড়ে সাধনা, নিষ্ঠা ও শিল্পীজনিত উৎকর্ষে গড়ে ওঠা এক অনন্য উত্তরাধিকার তিনি রেখে গেছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন তিনি। গত ৪০ দিন ধরে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। একাধিক অস্ত্রোপচারও হয়েছে। মূলত তিনি উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁর মৃরদেহ রাতভর হাসপাতালের মর্গে রাখা ছিল। আজ সোমবার সকালে গুয়াহাটিতে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শাস্ত্রীয় বিধিবিধান অনুযায়ী ক্রিয়াকর্মাদি সম্পন্নের পর নবগ্রহ শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছে।

মিনতি খাউন্দের জন্ম ১৯৪০ সালে। তাঁর সংগীতযাত্রা শুরু হয় মাত্র ১০ বছর বয়সে। মিনতির মাতামহ তাঁর সহজাত সংগীতপ্রতিভা অনুধাবন করে তাঁকে প্রথম বেহালাটি উপহার দিয়েছিলেন। ওই বেহালা তাঁর জীবনের দিশা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। যোরহাটের খ্যাতনামা দর্পনাথ শর্মা মিউজিক স্কুলে ইন্দ্রেশ্বর শর্মার কাছে তিনি প্রাথমিক সংগীতশিক্ষা লাভ করেন। সেখানে একজন সম্ভাবনাময় বেহালাবাদক হিসেবে তাঁর প্রতিভা বিকশিত হতে থাকে।

১৯৭২ সালে অল আসাম মিউজিক কনফারেন্স-এ পরিবেশনা তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়। সেখানে কিংবদন্তি বেহালাবাদক পণ্ডিত ভিজি যোগ তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে শিষ্যত্বে গ্রহণ করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে মিনতি খাউন্দ এক স্বতন্ত্র শৈলী গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে তন্ত্রকারি কৌশলের সূক্ষ্মতা ও সুরের মাধুর্য একাকার হয়ে যায়। পরে সরোদ গুরু পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কাছে তালিম নেন এবং প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী পণ্ডিত এটি কাননের কাছ থেকে ‘গায়কি অঙ্গ’-এর সূক্ষ্মতা আত্মস্থ করেন, যা তাঁর বেহালাবাদনে এক বিরল কণ্ঠসুলভ গভীরতা এনে দেয়।

পাঁচ দশকের বেশি দীর্ঘ সংগীতজীবনে মিনতি খাউন্দ দেশ-বিদেশের বহু মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে পরিবেশনা করেছেন। কলকাতার কলামন্দিরে রাইজিং ট্যালেন্টস কনফারেন্স, নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার, ন্যাশনাল গ্যালারি অব মডার্ন আর্ট, মুম্বইয়ের কালা ঘোড়া উৎসব, লন্ডনের নেহরু সেন্টার এবং বিভিন্ন সংগীত নাটক অকাদেমি উৎসবে তাঁর পরিবেশনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাম্প্ৰতিককালে তিনি প্ৰধানমন্ত্ৰী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে বিশেষ আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে বেহালা বাজিয়ে সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন।

গুরু-শিষ্য পরম্পরা রক্ষা করে তিনি প্রায়ই কন্যা সুনীতা খাউন্দের সঙ্গে যুগল পরিবেশনায় অংশ নিতেন। সবসময় অসমিয়া শাস্ত্রীয় সংগীতকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরেছেন তিনি।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৮৬ সালে প্রয়াগ সংগীত সমিতি থেকে মাস্টার অব মিউজিক (সংগীত নিপুণ) ডিগ্রি ও স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৯০ সালে তিনি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (আইসিসিআর)-এর এমপ্যানেলড শিল্পী হন। এছাড়া তিনি সংগীত জ্যোতি পুরস্কার, পাঁচ দশকের শিল্পসাধনার জন্য শিল্পী পুরস্কার এবং অসম সরকারের শিল্পী পেনশন লাভ করেন। তাঁর সৃজনশীল কাজের মধ্যে দুর্গাশক্তিকে উৎসর্গীকৃত অ্যালবাম ‘ইনভোক্যাশন অব মা’ শীৰ্ষক বিশেষ আধ্যাত্মিক ও সংগীতময় সৃষ্টি, যা তিনি কন্যার সঙ্গে দেশ-বিদেশে বহুবার পরিবেশন করেছেন।

মঞ্চের বাইরেও মিনতি খাউন্দ ছিলেন এক নিষ্ঠাবান গুরু, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক চিন্তাবিদ। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছাত্রছাত্রীকে সংগীতশিক্ষা দিয়েছেন। গুয়াহাটির একটি প্ৰথমসারির সংগীত কলেজে ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া রাজ্যস্তরের সংগীত পরীক্ষার প্যানেল পরীক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। একজন প্রাঞ্জল লেখক হিসেবে তিনি নিয়মিত সংগীত বিষয়ক প্রবন্ধ লিখতেন। এ সব লেখনির মাধ্যমে তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতকে আত্মশুদ্ধি, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির পথ হিসেবে তুলে ধরতেন।

মিনতি খাউন্দের জীবন ছিল সংগীতের প্রতি নিঃশর্ত আত্মনিবেদনের এক অনুপম উদাহরণ। তাঁর বেহালার সুর শুধু সংগীতই সৃষ্টি করেনি, তা বহন করেছে ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও আবেগের উত্তরাধিকার। অসম আজ তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক দূতকে বিদায় জানালেও, তাঁর সৃষ্টি, শিষ্য ও অমর সুরের মধ্য দিয়ে তাঁর উত্তরাধিকার চিরকাল ধ্বনিত হয়ে থাকবে।

হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস




 

 rajesh pande