

পূর্ব মেদিনীপুর, ১৪ অক্টোবর (হি.স.) : শিল্প শহর হলদিয়া ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে এ বছরও দুর্গাপূজা উপলক্ষে বেশ কিছু নজরকাড়া থিমভিত্তিক মণ্ডপ গড়ে তোলা হয়েছে। এরই মাঝে পূর্ব মেদিনীপুরের চৈতন্যপুরের 'উড়ান' নামক সামাজিক সংগঠন তাদের প্রথম বছরের দুর্গাপূজাতেই এক অনন্য সামাজিক ও শৈল্পিক ভাবনায় দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এ বছর তাদের পূজার মূল ভাবনা বা থিম রাখা হয়েছে—'মাটির পাত্রে অন্নপূর্ণা'।
বাঙালি জীবনে মাটির পাত্র চিরকালই সমৃদ্ধি ও দেবী অন্নপূর্ণার আশীর্বাদের প্রতীক। সেই আবহমান ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিকে উদ্ভাসিত করতেই উড়ান-এর এই ভিন্নধর্মী আয়োজন। শিল্পকলার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও পূজার মূল ভিত্তি করেছে এই সংস্থা। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সারা বছর ধরে অসহায় ও অভাবী মানুষদের অন্ন ও বস্ত্র সংস্থান থেকে শুরু করে চারাগাছ রোপণ ও পরিবেশ সুরক্ষার কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এই সংগঠনটি। মানবসেবা ও সামাজিক কল্যাণের এই ধারাবাহিক ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখেই চলতি বছর তারা প্রথমবার দুর্গাপূজা উদযাপনে পা বাড়াল।
মণ্ডপসজ্জায় দেখা গেছে অভিনবত্বের ছোঁয়া। ৩০ ফুট উঁচু, ২৫ ফুট চওড়া এবং ২৫ ফুট দৈর্ঘ্যের এই সুদৃশ্য মণ্ডপটি বাঁশ, প্রাকৃতিক তন্তু, হাজার হাজার মাটির ভাঁড় (কুলহাড়) এবং বর্ণময় কাপড়ের মেলবন্ধনে নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে। মণ্ডপের অভ্যন্তরীণ দেয়াল সুনিপুণ শৈল্পিক কায়দায় নাইলনের জাল এবং রঙিন শিফন সুতো দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। মণ্ডপের শিল্পসামগ্রী থেকে শুরু করে সূক্ষ্ম অলঙ্করণের রূপায়ণ করেছেন স্থানীয় প্রতিভাবান শিল্পী অমিত দাস। অন্যদিকে, প্রতিমা শিল্পী স্বপন গায়েনের হাতে গড়ে উঠছে দেবী দুর্গা ও তাঁর সন্তান লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের ঐতিহ্যবাহী মৃন্ময়ী রূপ।
সংগঠনের সভাপতি প্রদীপ সামন্ত, সম্পাদক প্রীতম নায়েক, পূজা কমিটির যুগ্ম সভাপতি প্রদীপ সামন্ত ও বিষ্ণুপদ সামন্ত, যুগ্ম সম্পাদক সুরজিৎ মণ্ডল ও সমীরন সিনহা, কোষাধ্যক্ষ কার্তিক মাইতি ও বিমান সাউদিয়া এবং অডিটর তরুণ মাইতি জানান যে, এই বছরের পূজায় বাংলার খাঁটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংস্থার সম্পাদক প্রীতম নায়েক ‘হিন্দুস্থান সমাচার’-কে বলেন, “আমাদের লোকজীবনে মাটির পাত্র হলো লক্ষ্মী ও সমৃদ্ধির রূপক। খাবারে ভরা ও শুভ আশীর্বাদে পূর্ণ এই পাত্রটি আমাদের ঐতিহ্যময় লোকসংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই অতি পরিচিত মাটির ভাঁড়কে এক শুভ ও পবিত্র চেতনায় দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপন করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।”
উৎসবের সার্বিক আনন্দের পাশাপাশি সমাজসেবার অঙ্গ হিসেবে পূজা উপলক্ষে সংস্থাটি ১৫০ জন অসহায় মানুষ, ৫০ জন অনাথ শিশু এবং ৩০ জন প্রবীণ নাগরিকের হাতে নতুন পোশাক তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে দিতে মণ্ডপে আগত দর্শনার্থীদের মাঝে বিনামূল্য ফলদ বৃক্ষের চারা বিতরণ করা হবে। এছাড়া ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যায় আয়োজিত হবে নানা বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। লোকসংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী শিল্প, সমাজসেবা ও পরিবেশ ভাবনার সমন্বয়ে চৈতন্যপুরের ‘উড়ান’-এর এই পুজো ইতিমধ্যেই স্থানীয় মানুষের প্রশংসাধন্য হয়ে উঠেছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সন্তোষ মধুপ