
নয়াদিল্লি, ১৩ মার্চ (হি.স.): ইরান, আমেরিকা ও ইজরায়েলের মধ্যে চলতে থাকা সংঘাত শুক্রবার ১৪তম দিনে পৌঁছেছে। ক্রমশ এই সংঘাতের প্রভাব পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। লেবাননে নতুন করে ইজরায়েলি হামলা, ইরাকে মার্কিন সামরিক বিমানের দুর্ঘটনা, শ্রীলঙ্কার কাছে ইরানি যুদ্ধজাহাজে হামলায় বহু নাবিকের মৃত্যু, পাশাপাশি তেলের অবকাঠামো নিয়ে ইরানের কঠোর সতর্কবার্তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
নরওয়ে সফরে গিয়ে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলা এই সামরিক অভিযানে জার্মানি কোনওভাবেই জড়িত নয় এবং তারা এই যুদ্ধে অংশ নিতে চায় না। তাঁর বক্তব্য, আমেরিকা ও ইজরায়েলের কাছে এই সংঘাত শেষ করার মতো স্পষ্ট কোনও পরিকল্পনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। দ্রুত সমাধান না হলে সংঘাত আরও বড় আকার নিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
এদিকে লেবাননে ইরানপন্থী গোষ্ঠী হিজবুল্লাও সংঘাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে ইজরায়েলকে একসঙ্গে দুই দিক থেকে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। জানা গিয়েছে, ইজরায়েলি বাহিনী রাজধানী বেইরুটের দক্ষিণ উপকণ্ঠে রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় হিজবুল্লার একাধিক ঘাঁটি লক্ষ্য করা হয়। লেবাননের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় দুই শিক্ষাবিদের মৃত্যুর খবর মিলেছে। পাল্টা জবাবে হিজবুল্লাও ইজরায়েলের দিকে রকেট ছুড়েছে।
অন্যদিকে ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন বায়ুসেনার একটি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, বিমানে থাকা ছয় জনের মধ্যে চার জনের মৃত্যু হয়েছে এবং দু’জন নিখোঁজ রয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, এই দুর্ঘটনা শত্রুপক্ষের হামলা বা ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-এর কারণে ঘটেনি। কেসি-১৩৫ বিমান আকাশেই যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহ করতে সক্ষম।
এই সংঘাতের মধ্যেই ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’-কে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং তাতে ক্ষতি হয়েছে। যদিও আমেরিকার পক্ষ থেকে এখনও এই দাবির সত্যতা স্বীকার করা হয়নি।
এদিকে শ্রীলঙ্কা জানিয়েছে, ৪ মার্চ তাদের উপকূলের কাছে ইরানের যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’-তে টর্পেডো হামলায় নিহত ৮৪ জন ইরানি নাবিকের দেহ শিগগিরই ইরানে পাঠানো হবে। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী ওই ঘটনার পর ৩২ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করেছিল। তাঁদের আপাতত শ্রীলঙ্কাতেই রাখা হয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইরানকে মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করেছে চীন ও রাশিয়া। চিনের রেডক্রস সোসাইটি ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে জরুরি সাহায্য হিসেবে দুই লক্ষ মার্কিন ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া আজারবাইজানের মাধ্যমে ১৩ টন ওষুধ ও ত্রাণসামগ্রী ইরানে পাঠিয়েছে।
এরই মধ্যে তেহরান থেকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে আইআরজিসি। তাদের দাবি, যদি ইরানের তেল-গ্যাস অবকাঠামো বা বন্দরগুলিতে হামলা চালানো হয়, তবে গোটা অঞ্চলের তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডারে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ঘটনা ঘটলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে আমেরিকার মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ওয়েস্ট ব্লুমফিল্ড এলাকায় ‘টেম্পল ইজরায়েল’ নামে একটি ইহুদি উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের গুলিতে এক সন্দেহভাজনের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনায় কয়েক জন নিরাপত্তারক্ষী আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে উপাসনালয়ের ভেতরে থাকা কেউ হতাহত হননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন শুধু পশ্চিম এশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সমুদ্রপথ, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য