
নয়াদিল্লি, ২৯ মার্চ (হি.স.): আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত এবং তার প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং এই সময় গুজব বা বিভ্রান্তির বদলে সচেতনতা ও একতার পথেই এগোতে হবে দেশকে।
রবিবার ‘মন কি বাত’-এর ১৩২-তম পর্বে তিনি বলেন, “বর্তমানে আমাদের প্রতিবেশী অঞ্চলে গত এক মাস ধরে এক ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। লক্ষ লক্ষ পরিবারের আত্মীয়-স্বজন এই দেশগুলিতে বাস করেন, বিশেষ করে যারা উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করেন। সেখানে থাকা ১ কোটিরও বেশি ভারতীয়কে সব ধরনের সহায়তা প্রদানের জন্য আমি উপসাগরীয় দেশগুলির কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। যে অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে, তা আমাদের জ্বালানি চাহিদার একটি প্রধান কেন্দ্র। এর ফলে বিশ্বজুড়ে পেট্রোল ও ডিজেলের সংকট তৈরি হচ্ছে।”
প্রধানমন্ত্রী জানান, “বৈশ্বিক সম্পর্ক, বিভিন্ন দেশের সহায়তা ও গত এক দশকে অর্জিত সক্ষমতার কারণেই ভারত দৃঢ়তার সঙ্গে এই প্রতিকূলতাগুলির মোকাবিলা করছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি কঠিন সময়। ‘মন কি বাত’-এর মাধ্যমে আমি আবারও দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই সংকট কাটিয়ে ওঠার আহ্বান জানাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “যারা এই বিষয়টিকে রাজনীতিকরণ করছেন, তাঁদের এমনটা করা উচিত নয়। এটি ১৪০ কোটি নাগরিকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি বিষয়। এখানে স্বার্থপর রাজনীতির কোনও স্থান নেই। যারা গুজব ছড়াচ্ছেন, তাঁরা দেশের ব্যাপক ক্ষতি করছেন। আমি সকল দেশবাসীকে সচেতন থাকার এবং গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য আবেদন করব। সরকার ক্রমাগত তথ্য সরবরাহ করছে। সেটির ওপর আস্থা রাখুন এবং তার ভিত্তিতেই পদক্ষেপ নিন।”
মোদী বলেন, “এই মার্চ মাসটি বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত ঘটনাবহুল ছিল। আমাদের সকলের মনে আছে, অতীতে কোভিডের কারণে সমগ্র বিশ্বকে দীর্ঘ সময় ধরে অসংখ্য সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। আমরা সকলেই আশা করেছিলাম, কোভিড সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পর বিশ্ব একটি নতুন সূচনার সঙ্গে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাবে, কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিস্থিতি ক্রমাগত দেখা দিতে থাকে।”
জনঅংশগ্রহণ ও ‘জ্ঞান ভারতম’ উদ্যোগে জোর
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ভারতের শক্তি দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যেই নিহিত।” তিনি ‘জ্ঞান ভারতম’ সমীক্ষার প্রসঙ্গ তুলে ধরে জানান, “আজ ‘মন কি বাত’-এ আমি এমন একটি উদ্যোগের কথা বলতে চাই যা দেশবাসীর অংশগ্রহণের চেতনাকে প্রতিফলিত করে। এই প্রচেষ্টাটি হলো ‘জ্ঞান ভারতম’ সমীক্ষা, যা আমাদের মহান সংস্কৃতি এবং সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর উদ্দেশ্য হলো সারা দেশের পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।”
তিনি আরও বলেন, “এই সমীক্ষায় যোগদানের একটি উপায় হলো ‘জ্ঞান ভারতম’ অ্যাপ। আপনার কাছে যদি কোনও পাণ্ডুলিপি বা সে সম্পর্কে কোনও তথ্য থাকে, তবে ‘জ্ঞান ভারতম অ্যাপ’-এ তার ছবি শেয়ার করুন। প্রতিটি এন্ট্রির তথ্য নথিভুক্ত করার আগে যাচাই করা হয়।”
একই সঙ্গে যুবশক্তির ভূমিকা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ভারত বিশ্বের নবীনতম দেশ। যখন দেশ গড়ার কাজে যুবশক্তির সদ্ব্যবহার করা হয়, তখন তা বিপুল সমর্থন জোগায়। দেশ গড়ার এই দায়িত্ব পালনে ‘মেরা যুব ভারত’ সংস্থা একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।”
জল সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা
গ্রীষ্মের প্রাক্কালে জল সংরক্ষণে গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশের অনেক অংশে গ্রীষ্মকাল শুরু হয়ে গেছে, যার অর্থ হলো জল সংরক্ষণের সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করার সময় এসেছে। গত ১১ বছরে জল সংরক্ষণ অভিযান মানুষের মধ্যে সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। এই অভিযানের অধীনে সারা দেশে প্রায় ৫০ লক্ষ কৃত্রিম জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, “অমৃত সরোবর অভিযানের অধীনেও সারা দেশে প্রায় ৭০,০০০ জলাধার তৈরি হয়েছে।”
স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি আপনাদের সবাইকেও চিনি খাওয়া কমানোর জন্য অনুরোধ করব এবং, যেমনটা আমি আগেও বলেছি, আমাদের রান্নার তেলও ১০ শতাংশ কমাতে হবে। এই ছোট ছোট প্রচেষ্টাগুলো আপনাদের স্থূলতা এবং জীবনযাত্রাজনিত রোগ থেকে দূরে রাখবে।”
খেলাধুলা, শিক্ষা ও সামাজিক উদ্যোগে উৎসাহ
প্রধানমন্ত্রী খেলাধুলায় সাফল্যের কথাও উল্লেখ করেন এবং বলেন, দেশের যুবসমাজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করছে, যা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে।
পাশাপাশি বিজ্ঞান শিক্ষায় উদ্ভাবনী উদ্যোগ, নাগা সম্প্রদায়ের ‘মোরুঙ্গ’ শিক্ষাপদ্ধতি এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সমষ্টিগত প্রচেষ্টার ওপর জোর
জল সংরক্ষণ, কৃষি, মৎস্যচাষ, নবীকরণযোগ্য শক্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমষ্টিগত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বড় পরিবর্তন সম্ভব।
সবশেষে দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, এই অনুষ্ঠান শুধু একটি রেডিও প্রোগ্রাম নয়, বরং এটি দেশের মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগের একটি সেতুবন্ধন। সকলকে সুস্থ থাকার আহ্বান জানিয়ে আগামী পর্বে আবারও নতুন অনুপ্রেরণার গল্প নিয়ে ফেরার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য