সাঁওতাল যুবসমাজকে শিক্ষা গ্রহণ এবং ভাষা-সংস্কৃতি সংরক্ষণের আহ্বান রাষ্ট্রপতির
কলকাতা, ৭ মার্চ (হি.স.): দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় অনেক মহান ব্যক্তিত্ব সেই স্থান পাননি যার তাঁরা যোগ্য ছিলেন। শনিবার উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে আয়োজিত নবম আন্তর্জাতিক সাঁওতাল সম্মে
রাষ্ট্রপতি


কলকাতা, ৭ মার্চ (হি.স.): দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় অনেক মহান ব্যক্তিত্ব সেই স্থান পাননি যার তাঁরা যোগ্য ছিলেন। শনিবার উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে আয়োজিত নবম আন্তর্জাতিক সাঁওতাল সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে এমনটাই বললেন, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। তিনি উল্লেখ করেন, এমন অনেক বীর ছিলেন যাঁদের নাম ইচ্ছাকৃতভাবে ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কাছে এটি গর্বের বিষয় যে প্রায় ২৪০ বছর আগে তাঁদের পূর্বপুরুষ তিলকা মাঝি শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর বিদ্রোহের প্রায় ৬০ বছর পর বীর ভ্রাতৃদ্বয় সিধু-কানহু এবং চাঁদ-ভৈরব ও তাঁদের সাহসী বোন ফুলো-ঝানো ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল হুল-এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ দেশের জন্য যে অবদান রেখেছেন, তা পর্যাপ্ত স্বীকৃতি পায়নি। তিলকা মাঝি, সিধু-কানহু এবং চাঁদ-ভৈরবদের মতো অনেক নাম ইতিহাসে পুরোপুরি নথিবদ্ধ হতে পারেনি। তাঁদের অবদান যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে ইতিহাস তাঁদের নামেই পূর্ণ থাকত। তিনি সাঁওতালদের বীরত্বের প্রশংসা করে বলেন, এই সম্প্রদায় হীনম্মন্যতা স্বীকার করে না এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। সাঁওতালরা একটি সাহসী ও স্বাবলম্বী জাতি, যাঁদের নিজেদের গৌরবময় ইতিহাসের জন্য গর্বিত হওয়া উচিত।

উন্নয়নের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাঁওতাল এবং অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে উন্নয়নের সুফল পর্যাপ্তভাবে পৌঁছায়নি। আদিবাসী সমাজকে শিক্ষা, সুযোগ এবং উন্নয়নের মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের ক্ষেত্রে কিছু বাধার ইঙ্গিত দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি যখন এখানে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তাঁর মনে হয়েছিল কিছু মানুষ এই বৈঠকের পক্ষে ছিলেন না। তাঁর মতে, কিছু লোক চায় না যে সাঁওতাল সম্প্রদায় এগিয়ে আসুক, শিক্ষা লাভ করুক এবং সংগঠিত হয়ে শক্তিশালী হোক।

রাষ্ট্রপতি মুর্মু সাঁওতাল পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মাইলফলকগুলিও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ২০০৩ সাল সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, কারণ ওই বছরই সাঁওতালি ভাষাকে ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তিনি আরও জানান, গত বছর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর জন্মজয়ন্তীতে অলচিকি লিপিতে সংবিধানের সাঁওতালি সংস্করণও প্রকাশ করা হয়েছে।

এই উপলক্ষে তিনি অলচিকি লিপির জনক পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মুর প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯২৫ সালে পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু অলচিকি লিপি উদ্ভাবন করেন, যা সাঁওতালি ভাষাভাষীদের প্রকাশের এক নতুন মাধ্যম দেয়। তিনি ‘বিদূ চন্দন’, ‘খেরওয়াল বীর’, ‘ডালেগে ধন’ এবং ‘সিধু কানহু-সাঁওতাল হুল’-এর মতো নাটকের মাধ্যমে সাহিত্য ও সামাজিক চেতনার প্রসার ঘটিয়েছিলেন।

রাষ্ট্রপতি সাঁওতাল সমাজকে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করার পাশাপাশি অন্যান্য ভাষা শেখারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি শতাব্দীকাল ধরে তাঁদের লোকসংগীত, লোকনৃত্য ও ঐতিহ্যকে আগলে রেখেছেন এবং প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীলতাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। প্রকৃতি সংরক্ষণের এই বার্তা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আদিবাসী সমাজকে তাঁদের ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি আধুনিক উন্নয়নকেও গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস প্রকাশ করেন যে, সাঁওতাল-সহ সমস্ত আদিবাসী সম্প্রদায় প্রগতি এবং প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্যের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠবে।

বক্তব্যের শেষে রাষ্ট্রপতি আদিবাসী যুবকদের শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় নিজেদের শিকড়, ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভুলে যাওয়া চলবে না। সমাজে একতা ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রেখেই এক শক্তিশালী সমাজ তথা শ্রেষ্ঠ ভারত গঠন সম্ভব।

হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি




 

 rajesh pande