
শিলিগুড়ি, ১২ এপ্রিল (হি.স.) : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের দ্বিতীয় দিনে শিলিগুড়ির মাটি থেকে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে একযোগে ‘অস্তিত্বহীন’ ও ‘নিষ্ঠুর’ বলে দেগে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রবিবার উত্তরের এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য শহরে আয়োজিত এক বিশাল জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, এই নির্বাচনের ফল বেরোনোর পরই বাংলা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিদায় নিশ্চিত। তাঁর মতে, গত ১৫ বছরের অপশাসনে তৃণমূল কেবল রাজ্যের সুনাম নষ্ট করেনি, বরং বাংলাকে ধ্বংসের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।
এদিন শিলিগুড়ি থেকে প্রধানমন্ত্রী দার্জিলিং জেলার ৫টি এবং জলপাইগুড়ি জেলার ৭টি বিধানসভা আসনের বিজেপি প্রার্থীদের হয়ে জোরদার প্রচার করেন। উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “আপনাদের এই সমর্থনই বলে দিচ্ছে উত্তরবঙ্গ এবার পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। এই বিশাল জনসভা তৃণমূল শিবিরের ঘুম উড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে ‘নিষ্ঠুর’ ও ‘তোষণকারী’ বলে আক্রমণ শানিয়ে মোদী বলেন, “রাজ্য সরকার কেবল একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে কাজ করে। তৃণমূল সরকার মাদ্রাসার উন্নয়নে প্রায় ৬০০০ কোটি টাকা খরচ করেছে, কিন্তু বিশাল উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করেনি।” প্রধানমন্ত্রী সরাসরি অভিযোগ করেন, “তৃণমূল শুধু নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ককে খুশি করতে ব্যস্ত। যখন উত্তরবঙ্গের অনেক অঞ্চলে প্রবল বৃষ্টিতে মানুষ বিপর্যস্ত ছিল, তখন তৃণমূল সরকার কলকাতায় উৎসব পালন করছিল। তৃণমূল আদতে উত্তরবঙ্গ-বিরোধী, আদিবাসী-বিরোধী এবং চা বাগান-বিরোধী দল।”
আদিবাসী সমাজকে কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার আদিবাসী অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার দু'টি প্রধান প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আমাদের লক্ষ্য আদিবাসী এলাকায় পাকা রাস্তা, বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্কুল ও হাসপাতাল তৈরি করা। কিন্তু নিষ্ঠুর তৃণমূল সরকার সেই প্রচেষ্টায় ক্রমাগত বাধা দিচ্ছে, যাতে আদিবাসী গ্রামগুলিতে উন্নয়নের আলো না পৌঁছায়।” তিনি সাফ জানান, মমতা সরকারকে এবার ১৫ বছরের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে।
উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা চা বাগানগুলির বেহাল দশা নিয়ে সরব হন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “দার্জিলিং সহ উত্তরবঙ্গের চায়ের স্বাদ আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে? অথচ তৃণমূল সরকার এই চা বাগানগুলিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।” এর বিপরীতে প্রতিবেশী রাজ্য অসমের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “অসমে বিজেপি সরকার চা বাগানের শ্রমিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের জন্য কাজ করছে। সেখানে শ্রমিকদের জমির ইজারা দেওয়া হচ্ছে। বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে চা বাগানের পরিবারগুলিকে জমির ইজারা, স্থায়ী বাড়ি, পরিশ্রুত পানীয় জল এবং বিদ্যুতের সুবিধা দেওয়া হবে।”
শিলিগুড়ির ভৌগোলিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শিলিগুড়ি করিডোর কেবল একটি পথ নয়, এটি ভারতমাতার বাহু এবং ভারতের নিরাপত্তার প্রধান প্রবেশদ্বার। অথচ ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির জন্য তৃণমূল এই অঞ্চলের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করতেও পিছপা হয়নি।” তিনি অভিযোগ করেন, তোষণের রাজনীতির কারণেই সীমান্ত সুরক্ষা ও দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে আপস করছে বর্তমান রাজ্য সরকার।
বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী রাজ্যের যুবশক্তির ওপর ভরসা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে তৃণমূল। বাংলার যুবসমাজ এবার তাদের ভোটের মাধ্যমে সেই ভয় জয় করবে এবং রাজ্যের ভবিষ্যৎ গড়বে। এটি অপশাসনের মূল্যায়ন করার মাহেন্দ্রক্ষণ।”
এদিন শিলিগুড়িতে মোদীর রোড শো-কে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা দেখা যায়। সেই আবেগকে সঙ্গী করে মোদী বলেন, “শিলিগুড়ির মানুষ যে ভালোবাসা ও সমর্থন আমায় দিয়েছেন, তা আমি কোনোদিন ভুলব না। বাংলার মানুষের এই ভালোবাসা এবার বুথে বুথে পদ্ম ফোটাবে।”
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি