
নয়াদিল্লি, ৩১ মে (হি.স.) : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রবিবার ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানের ১৩৪-তম পর্বে দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে তরুণদের সাফল্য, প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার, গ্রীষ্মকালীন ফল ও ঐতিহ্যবাহী পানীয়, জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি যুবসমাজের আগ্রহ, সেনা কল্যাণে নাগরিকদের অবদান, নদী পরিচ্ছন্নতা এবং বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ-সহ একাধিক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। একইসঙ্গে তিনি জাতি গঠন, সাংস্কৃতিক গর্ব এবং সম্মিলিত উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে আয়োজিত ন্যাশনাল সিনিয়র অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি জানান, কিছুদিন আগে ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে জাতীয় সিনিয়র অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে ৪টি ভিন্ন ইভেন্টে ৪টি জাতীয় রেকর্ড ভেঙেছে। গুরিন্দরবীর সিং, বিশাল টি কে, তেজস্বিনী শঙ্কর, দেব মীনা এবং কুলদীপ কুমার বিভিন্ন বিভাগে নতুন রেকর্ড করেছেন। আমি তাঁদের আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাই। তিনি আরও বলেন, মাত্র ২ দিনের মধ্যে ১০০ মিটার দৌড়ের জাতীয় রেকর্ড তিনবার ভেঙেছে। যে ২ জন অ্যাথলেট এই অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তাঁরা হলেন গুরিন্দরবীর সিং এবং অনিমেশ কুজুর। আমি ভাবলাম যে এবার 'মন কি বাত'-এ এই ২ জন অ্যাথলেটের সঙ্গে কথা বলা যাক।
'মন কি বাত' অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে কথোপকথনে ক্রীড়াবিদ অনিমেশ কুজুর বলেন, গত বছর আমি ন্যাশনাল এশিয়ান মেডেল এবং ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি গেমস মেডেল জিতেছি এবং আমি ২০২১ সালে অ্যাথলেটিক্স শুরু করি, যখন আমি স্কুল থেকে পাশ করি। যখন কোভিড শেষ হচ্ছিল, আমার ফুটবল বন্ধুরা আমাকে রাজ্য পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বলেছিল এবং আমি তা করেছিলাম। আমি জাতীয় স্তরের নির্বাচনের বিষয়ে অবগত ছিলাম না। আমি জাতীয় স্তরে নির্বাচিত হই এবং এখন আমি আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করি। ক্রীড়াবিদ গুরিন্দরবীর সিং বলেন, আমি ভারতীয় নৌবাহিনীর একজন অফিসার। আমি ট্র্যাকে ও ইউনিফর্মে দেশের সেবা করার চেষ্টা করছি। আমার বাবা আমাকে নিজের খেলাধুলো এবং জাতীয় পদক জেতার গল্প বলতেন। তখন আমিও খেলাধুলো করতে চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে নিয়ে যেতে শুরু করেন এবং তাঁর খেলাধুলোর সময় যা যা শিখেছিলেন, তার সবকিছু শেখাতে শুরু করেন। আমি উসাইন বোল্টের বিশ্ব রেকর্ড ভাঙতে দেখেছি। আমি আমার মাকে বলেছিলাম যে, এমন একটা সময় আসবে যখন তুমি আমাকে টিভিতে দেখবে। আমি মিলখা সিং এবং আমার বাবার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।।
সাম্প্রতিক নেদারল্যান্ডস সফরের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে এক অনুষ্ঠানে চোল যুগের ২১টি বড় এবং ৩টি ছোট তাম্রফলক ভারতের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে আমি ইউরোপের নেদারল্যান্ডস সফরের সুযোগ পেয়েছিলাম, যেখানে আমি বেশ কয়েকটি বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছি। সেখানকার একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে চোল আমলের প্রাচীন তাম্রফলকগুলো ভারত সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই অনুষ্ঠানে নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। আমি এই ফলকগুলো সম্পর্কে দেশ-বিদেশ থেকে ক্রমাগত বার্তা পাচ্ছি। বিশ্বজুড়ে তামিল সম্প্রদায়ের মধ্যেও বিশেষ উন্মাদনা বিরাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, এখানে ২১টি বড় এবং ৩টি ছোট তাম্রফলক রয়েছে। এগুলো প্রধানত রাজা প্রথম রাজেন্দ্র চোলের সঙ্গে সম্পর্কিত। এতে আনাইমঙ্গলম গ্রামটি বৌদ্ধ বিহারকে দান করার কথা উল্লেখ আছে। এগুলোতে চোল রাজবংশের কৃতিত্বের বর্ণনাও রয়েছে। এগুলো রাজবংশের শক্তিশালী সামুদ্রিক শক্তির পরিচয় দেয়। আমরা সকলেই চোল সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত। আমাদের সরকার এই ধরনের অমূল্য ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য ক্রমাগত কাজ করে চলেছে।
গ্রীষ্মকাল প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিখ্যাত আমের প্রজাতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ অংশই তীব্র গরমে কাবু। এই ঋতুতে নিজের যত্ন নেওয়া খুব জরুরি - জল পান করতে থাকুন, রোদে বের হওয়ার সময় সতর্ক থাকুন। সরকারের বিভিন্ন দফতর থেকে জারি করা নির্দেশিকাগুলি ভুলবেন না।
তিনি আরও বলেন, ঐতিহ্যবাহী পানীয়গুলির সঙ্গে আপনারাও পরিচিত। উত্তর ভারতে আম পান্না পাওয়া যায়। পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় বড় গ্লাসে লস্যি পাওয়া যায়, রাজস্থান ও গুজরাটে ঘোল প্রতিটি খাবারের অংশ হয়ে ওঠে এবং বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পূর্ব উত্তর প্রদেশে সাত্তু শরবতের কোনও তুলনা হয় না, কারণ এটি পেট ভরায় এবং শক্তিও জোগায়। কোঙ্কন ও গোয়ায় কোকুম শরবত, সোল কড়ি খাওয়া হয়, দক্ষিণ ভারতে পানাকাম, নীর মোড় ও শম্বরম পাওয়া যায়; এবং ওড়িশায় বেলা পান্না। এগুলি 'এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত'-এর চেতনাকেও প্রতিফলিত করে। গ্রীষ্মকালে আপনারাও এই ধরনের ঐতিহ্যবাহী পানীয় উপভোগ করবেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, গ্রীষ্মের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি ঘরে ঘরে আরেকটি আলোচনা শুরু হয় - সেটি হলো আম নিয়ে... মহারাষ্ট্র এবং কোঙ্কনে আছে হাপু, আলফোনসো, গুজরাটের কেশর হলো আম্রস আমের প্রাণ। উত্তর প্রদেশে আছে দশেরি আর আমার কাশীতে আছে ল্যাংড়া। আমের যাত্রা এখন গ্রাম থেকে বিশ্ব বাজারেও পৌঁছে যাচ্ছে। আমি আম চাষের সঙ্গে যুক্ত আমার কৃষক বন্ধুদের প্রশংসা করতে চাই। দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য আপনারা সাধারণ কৃষক নন, বরং একজন বিশেষ কৃষক।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি তরুণদের আগ্রহের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি ভারতীয়দের বরাবরই বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে, মন কি বাত অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একইসঙ্গে তিনি বলেন, আমি যুবকদের অবশ্যই একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান ক্লাবে যোগ দিতে উৎসাহিত করব এবং এই ছুটির সময়, অবশ্যই একটি প্ল্যানেটেরিয়ামেও ঘুরে আসতে বলব।
'মন কি বাত'-এর ১৩৪-তম পর্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি ভারতীয়দের বরাবরই এক বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। আমাদের দেশে আজও শতবর্ষ পুরোনো মানমন্দির রয়েছে। আজকের যুবসমাজ এ বিষয়ে দারুণ উৎসাহ দেখাচ্ছে, আমি সম্প্রতি ব্যাঙ্গালোর অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি সম্পর্কে জানতে পেরেছি, তারা পর্যবেক্ষণের আয়োজন করে। এই সংস্থাটি গ্রামীণ এলাকায় জ্যোতির্বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য একটি মিশনও শুরু করেছে। 'খাগোল মন্ডল' নামে একটি দল জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর একটি অভিনব ৩০-ঘণ্টার কোর্স শুরু করেছে। অ্যাস্ট্রো-কেরলম নামে একটি সংস্থাও রাতের পর্যবেক্ষণ শিবির এবং কর্মশালার আয়োজন করে। এখানে তরুণ বন্ধুরা টেলিস্কোপ তৈরি করতে এবং নক্ষত্রের মানচিত্র ব্যবহার করতে শেখে। আমি আইজ্যাক-এর কথাও উল্লেখ করতে চাই - এটি একটি ছাত্র-নেতৃত্বাধীন দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক যা সারা দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান ক্লাবগুলিকে সংযুক্ত করে। আমি যুবকদের অবশ্যই একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান ক্লাবে যোগ দিতে উৎসাহিত করব এবং এই ছুটির সময়, অবশ্যই একটি প্ল্যানেটেরিয়ামেও ঘুরে আসতে বলব।
সেনা কল্যাণে তামিলনাড়ুর শিক্ষিকা গিরিজা অম্মার উদ্যোগেরও প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, গিরিজা অম্মা তাঁর স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহিত করে প্রতিদিন এক টাকা করে সংগ্রহ করে প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা সেনা কল্যাণ তহবিলে প্রদান করেছেন।
পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উত্তর প্রদেশের বস্তি জেলার যুবক আকাশ গুপ্তর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আকাশ ও তাঁর বন্ধুরা মনোরমা নদী থেকে প্রতিদিন ৫০-৬০ কেজি প্লাস্টিক ও আবর্জনা সরিয়ে নদী পরিষ্কারের কাজে নেমেছিলেন।
এছাড়া গোয়ার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বালকৃষ্ণ আড়য়ার জলসংকট নিরসনের উদ্যোগ এবং ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্পের আওতায় গঙ্গার ডলফিন উদ্ধারের ঘটনাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ১৩ ঘণ্টার নিরলস প্রচেষ্টার পর একটি গঙ্গার ডলফিনকে উদ্ধার করে নিরাপদে রাপ্তি নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য