বিষাক্ত রং ভাঙবে ব্যাকটেরিয়া, পথ দেখাচ্ছে আইআইটি গুয়াহাটির গবেষণা টেক্সটাইল বর্জ্যজল শোধনে নতুন সাফল্য, ‘ডাইরেক্ট ব্লু-৬’-এর ৯৮.৫০ শতাংশ অবক্ষয়, তৈরি অ-বিষাক্ত পদার্থ
হাফলং (অসম), ১৬ সেপ্টেম্বর (হি স): কারখানার নীল রং মিশে দূষিত হচ্ছে জল। সেই বিষাক্ত রংকে ভেঙে তুলনামূলক নিরাপদ করে তুলবে জীবাণু! টেক্সটাইল শিল্পের বর্জ্যজলে থাকা ক্ষতিকর অ্যাজো রং শোধনের এমনই এক পরিবেশবান্ধব পথের সন্ধান দিয়েছেন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট
Photo


হাফলং (অসম), ১৬ সেপ্টেম্বর (হি স): কারখানার নীল রং মিশে দূষিত হচ্ছে জল। সেই বিষাক্ত রংকে ভেঙে তুলনামূলক নিরাপদ করে তুলবে জীবাণু! টেক্সটাইল শিল্পের বর্জ্যজলে থাকা ক্ষতিকর অ্যাজো রং শোধনের এমনই এক পরিবেশবান্ধব পথের সন্ধান দিয়েছেন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) গুয়াহাটির গবেষকেরা। তাঁদের গবেষণায় ‘ব্রেভুন্ডিমোনাস এসপি. এজেড০৫’ নামে একটি ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে বহুল ব্যবহৃত কৃত্রিম রং ‘ডাইরেক্ট ব্লু-৬’-এর ৯৮.৫০ শতাংশ পর্যন্ত অবক্ষয় ঘটানো সম্ভব হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, এই প্রক্রিয়ায় তৈরি অবক্ষয়জাত পদার্থগুলিকে পরীক্ষায় অ-বিষাক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

টেক্সটাইল শিল্পের বর্জ্যজলে অ্যাজো রং থাকা নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু এই রংয়ের রাসায়নিক গঠন অত্যন্ত স্থিতিশীল। ফলে সাধারণ পদ্ধতিতে তা সহজে নষ্ট হয় না। রংয়ের অণুতে থাকা বিশেষ অ্যাজো বন্ধনই (–N=N–) তার রং এবং রাসায়নিক স্থায়িত্বের অন্যতম কারণ। অপরিশোধিত অবস্থায় এই ধরনের বর্জ্যজল নদী, জলাশয় এবং অন্যান্য জলজ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। মানবস্বাস্থ্যের উপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শুধু তাই নয়, প্রচলিত রাসায়নিক বা ভৌত-রাসায়নিক পদ্ধতিতে বর্জ্যজল শোধন করতে যথেষ্ট শক্তির প্রয়োজন হতে পারে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়ায় আবার নতুন দূষকও তৈরি হয়। ফলে জল থেকে চোখে দেখা রং সরিয়ে ফেললেই যে দূষণের মূল সমস্যার সমাধান হয়ে গেল, তা নয়।

এই সমস্যার মোকাবিলাতেই নতুন পথ খুঁজেছেন আইআইটি গুয়াহাটির গবেষকেরা। স্থানীয় একটি টেক্সটাইল বর্জ্য নির্গমনস্থল থেকে তাঁরা সংগ্রহ করেন ‘ব্রেভুন্ডিমোনাস এসপি. এজেড০৫’ ব্যাকটেরিয়া। পরীক্ষায় দেখা যায়, এই ব্যাকটেরিয়া ‘অ্যাজোরিডাক্টেজ’ নামে একটি এনজাইম তৈরি করে। সেই এনজাইম অ্যাজো বন্ধন ভাঙতে সক্ষম। অর্থাৎ, রংয়ের অণুর গুরুত্বপূর্ণ অংশটিকেই আক্রমণ করে ব্যাকটেরিয়াটি।

গবেষকেরা বিশেষ পরিসংখ্যানভিত্তিক পদ্ধতির সাহায্যে ব্যাকটেরিয়ার রং ভাঙার ক্ষমতা এবং অ্যাজোরিডাক্টেজ তৈরির মাত্রা একই সঙ্গে সর্বোত্তম পর্যায়ে নিয়ে আসেন। অনুকূল পরিস্থিতিতে ‘ডাইরেক্ট ব্লু-৬’-এর ৯৮.৫০ শতাংশ অবক্ষয় ঘটাতে সক্ষম হয় ব্যাকটেরিয়াটি। অ্যাজোরিডাক্টেজের কার্যক্ষমতা পাওয়া যায় প্রতি মিলিলিটারে ০.৭৬১ ইউনিট।

শুধু রং সরানো নয়, বিষাক্ততাও পরীক্ষা

গবেষণাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, গবেষকেরা শুধু জল থেকে রং কতটা দূর হল, তা মেপেই থামেননি। ব্যাকটেরিয়া রং ভাঙার পরে কী ধরনের পদার্থ তৈরি করছে, সেগুলিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেই অবক্ষয়জাত পদার্থের বিষাক্ততাও পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় সেগুলিকে অ-বিষাক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইআইটি গুয়াহাটির জীববিজ্ঞান ও জৈবপ্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সেলভারাজু নারায়ণস্বামী বলেন, এই গবেষণার বিশেষত্ব হল, শুধু দূষিত জলের দৃশ্যমান রং দূর করার দিকে নজর দেওয়া হয়নি। বরং রং ভাঙার পরে তৈরি পদার্থগুলির বিষাক্ততাও যাচাই করা হয়েছে। তাঁর কথায়, এর ফলে দূষিত জলকে শুধু দেখতে পরিষ্কার করার বদলে রংকে তুলনামূলক নিরাপদ যৌগে রূপান্তরের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

তবে এখনও গবেষণাটি পরীক্ষাগারের স্তরেই রয়েছে। গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য হল এই জীবাণুকে একটি উপযুক্ত মাধ্যমে স্থির করে তার স্থায়িত্ব, কার্যক্ষমতা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এর পরে টেক্সটাইল শিল্পের বর্জ্যজলকে ধারাবাহিক ভাবে শোধন করতে পারে— এমন একটি বৃহৎ পরিসরের ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

শিল্পবর্জ্যেও মিলতে পারে ব্যবহার

গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। একাধিক ধাতব আয়নের উপস্থিতিও সহ্য করতে পারে এই ব্যাকটেরিয়া। বাস্তব শিল্পবর্জ্যে একসঙ্গে নানা ধরনের দূষক থাকার কারণে এই বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতের প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে টেক্সটাইল শিল্পের স্থায়ী অ্যাজো রংযুক্ত বর্জ্যজল শোধন করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে অন্যান্য শিল্পবর্জ্যে থাকা কৃত্রিম অ্যাজো রং ভাঙার ক্ষেত্রেও এই জীবাণু ও তার উৎপাদিত এনজাইম নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। রাসায়নিকনির্ভর শোধন পদ্ধতির ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশের উপর চাপ কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রকের প্রধানমন্ত্রী গবেষণা ফেলোশিপের সহায়তায় পরিচালিত এই গবেষণায় আইআইটি গুয়াহাটির অজিতকুমার ভেলুচামি, জোথিকা জেয়াবালান ও ড. সেলভারাজু নারায়ণস্বামী এবং আইআইটি (বিএইচইউ), বারাণসীর ড. অঙ্কুর ভার্মা যুক্ত ছিলেন। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকা Environmental Geochemistry and Health-এ।

পরীক্ষাগারের এই সাফল্যকে শিল্পক্ষেত্রে কার্যকর প্রযুক্তিতে রূপ দিতে পারলেই টেক্সটাইল বর্জ্যজল শোধনের ক্ষেত্রে রাসায়নিকনির্ভরতার পাশাপাশি জীবাণুভিত্তিক এক নতুন পথ খুলে যেতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

হিন্দুস্থান সমাচার / বিশাখা দেব




 

 rajesh pande