সন্ধিক্ষণে শূন্যে গুলির আওয়াজ ও মশালের আলো, মানকরের বিশ্বাসবাড়িতে ৩৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসব
দুর্গাপুর, ৯ সেপ্টেম্বর (হি.স.): জীবন আমার নাম/ মানকরে মোর ধাম/ জিলা বর্ধমান। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘স্পর্শমণি’ কবিতায় উল্লিখিত পশ্চিম বর্ধমানের প্রাচীন ও ঐতিহ্যমণ্ডিত গ্রাম মানকর। অসংখ্য প্রাচীন স্থাপত্য, জরাজীর্ণ জমিদারবাড়ি ও স
মানকরের বিশ্বাসবাড়িতে ৩৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসব


দুর্গাপুর, ৯ সেপ্টেম্বর (হি.স.): জীবন আমার নাম/ মানকরে মোর ধাম/ জিলা বর্ধমান। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘স্পর্শমণি’ কবিতায় উল্লিখিত পশ্চিম বর্ধমানের প্রাচীন ও ঐতিহ্যমণ্ডিত গ্রাম মানকর। অসংখ্য প্রাচীন স্থাপত্য, জরাজীর্ণ জমিদারবাড়ি ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহনকারী এই মানকর গ্রামেই সাড়ে তিনশো বছর ধরে কালিকা পুরাণ মতে মহাসমারোহে পূজিতা হয়ে আসছেন মা দুর্গা। কবিগুরু বর্ণিত মানকরের বিশ্বাসবাড়ির এই দুর্গোৎসবের পেছনে জড়িয়ে রয়েছে এক অলৌকিক কাহিনি ও নবাবী আমলের বর্ণময় ইতিহাস।

ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, নবাব আলীবর্দী খাঁয়ের রাজত্বকালে মারাঠা বর্গী আক্রমণের সময়ে নবাবের খাজাঞ্চি রামনারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় নিজের জীবন বাজি রেখে রাজকীয় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রক্ষা করেছিলেন। তাঁর এই অসামান্য বিশ্বস্ততায় মুগ্ধ হয়ে নবাব আলীবর্দী খাঁ তাঁকে বিপুল ধনসম্পত্তির পাশাপাশি ‘বিশ্বাস’ খেতাবে ভূষিত করেন। এর পর গঙ্গোপাধ্যায় পদবি ত্যাগ করে তিনি 'বিশ্বাস' পদবি গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে নবাবের দেওয়া বিপুল সম্পত্তি এবং নিজস্ব তসরের ব্যবসায় তিনি অঢেল ধনসম্পদের মালিক হলেও রামনারায়ণবাবু নিঃসন্তান ছিলেন।

পুত্রলাভের তীব্র আকুলতায় তিনি সমস্ত সম্পত্তি ত্যাগ করে নিঃস্ব অবস্থায় মানকরে এসে পর্ণকুটির বেঁধে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই দেবী দুর্গা তাঁকে স্বপ্নে আদেশ দেন দুর্গোৎসব শুরু করার। দেবীর স্বপ্নাদেশ মেনে মানকরের একচালা ঘরেই তিনি ষোড়শ উপচারে মায়ের পুজো শুরু করেন। মায়ের আশীর্বাদে তাঁর কোল আলো করে জন্ম নেয় পুত্র সন্তান, যাঁর নাম রাখা হয় দুর্গাদাস। পরবর্তীতে মানকরে নির্মিত হয় ৪২ ইঞ্চি শক্ত দেওয়ালে রোমান ও আধুনিক স্থাপত্যের সমন্বয়ে নির্মিত বিশাল দুর্গামন্দির, বসতবাটী, রাজমহল, পঞ্চমুণ্ডির আসন ও তিনটি শিবমন্দির। এই পরিবারেরই অন্যতম প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব মহেশচন্দ্র বিশ্বাস কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিংহের দেওয়ান ছিলেন, যিনি কাশ্মীর ভ্রমণকালে স্বামী বিবেকানন্দের আতিথেয়তার দায়িত্বে ছিলেন।

বিশ্বাসের বাড়ির এই দুর্গোৎসবে আজও প্রাচীন রীতিনীতি কড়াকড়িভাবে মেনে চলা হয়। উল্টোরথের দিন প্রতিমার কাঠামো পুজো হয়। পঞ্চমীতে দেবীর হাতে অস্ত্র অর্পণ এবং ষষ্ঠীতে বোধনের পর দেবীকে বহুমূল্য সোনার ও রূপোর গহনায় সাজানো হয়। সপ্তমীর দিন দোলায় চেপে নবপত্রিকা স্নানে নিয়ে যাওয়া হয়। এই পুজোয় নারীদের ভোগ রান্নার অধিকার নেই, কেবল ব্রাহ্মণ পুরুষরাই ভোগ রন্ধন করেন। সপ্তমীতে সাত রকমের ভাজা ও সাত সের গোবিন্দভোগ চালের পোলাও, অষ্টমীতে আট রকম ভাজা ও আট সের চালের খিচুড়ি এবং নবমীতে অন্নভোগ ও নয় রকম ভাজা নিবেদন করা হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় গাওয়া ঘিয়ে তৈরি লুচির ভোগ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।

সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী— তিন দিনই এই বাড়িতে ছাগ বলির প্রথা রয়েছে, যার মধ্যে অষ্টমীর রাতে নিশি কালো ছাগ বলি দেওয়া হয়। ঐতিহ্য অনুযায়ী, আগে সন্ধিপুজোর মাহেন্দ্রক্ষণে কামান দাগা হলেও বর্তমানে তার পরিবর্তে আকাশে শূন্যে গুলি চালিয়ে সন্ধিপুজোর সূচনা করা হয়। একই সঙ্গে ঠাকুরদালানের চার কোণে চারজন মশাল হাতে দাঁড়ান এবং ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো হয়। বিশ্বাসবাড়ির এই গুলির শব্দ শুনেই আশেপাশের গ্রামের অন্যান্য দুর্গামন্দিরে সন্ধিপুজো শুরু করার প্রাচীন প্রথা আজও বজায় রয়েছে।

নবমীর দিন বিশ্বাসবাড়ির পক্ষ থেকে বিশাল নরনারায়ণ সেবার আয়োজন করা হয়, যেখানে আশেপাশের গ্রামের প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার মানুষ প্রসাদ গ্রহণ করেন। দশমীর দিন পরিবারের নিজস্ব পুকুরে ঘট ও কলাবৌ বিসর্জনের পর প্রথা মেনে প্রতিমা বরণ সম্পন্ন হয়। পরিবারের সদস্য তথা অন্যতম তত্ত্বাবধায়ক সুজিত বিশ্বাস জানান, শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও পরিবারের সদস্যরা সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রেখে ৩৫০ বছরের এই প্রাচীন ঐতিহ্য ও দেবীর আরাধনাকে একইভাবে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা




 

 rajesh pande