অসমকে অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দিয়েছিল কংগ্রেস, কংগ্রেস থেকে সতর্ক থাকার ডাক প্রধানমন্ত্রীর
- ২০২৫ সালে কাজিরাঙায় একটিও গণ্ডার শিকার হয়নি, এর কৃতিত্ব অবশ্যই বিজেপি সরকারের : মোদী - উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে অবহেলা করত কংগ্রেস কলিয়াবর (অসম), ১৮ জানুয়ারি (হি.স.) : কংগ্রেস শাসনামলে অসমে ব্যাপক হারে অনুপ্রবেশ ঘটতে দেওয়া হয়েছে। অসমকে বাংলাদেশি অ
কালিয়াবরে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী


জনসভায় জনতার ঢল


- ২০২৫ সালে কাজিরাঙায় একটিও গণ্ডার শিকার হয়নি, এর কৃতিত্ব অবশ্যই বিজেপি সরকারের : মোদী

- উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে অবহেলা করত কংগ্রেস

কলিয়াবর (অসম), ১৮ জানুয়ারি (হি.স.) : কংগ্রেস শাসনামলে অসমে ব্যাপক হারে অনুপ্রবেশ ঘটতে দেওয়া হয়েছে। অসমকে বাংলাদেশি অনুপ্ৰবেশকারীদের হাতে তুলে দিয়েছিল কংগ্রেস। একমাত্র ভোটব্যাংকের স্বার্থে অনুপ্রবেশকারীদের হাতে অসমের লক্ষ লক্ষ বিঘা জমি তুলে দেওয়া হয়েছিল। বক্তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি কংগ্ৰেস থেকে রাজ্যবাসীকে সতৰ্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

অসমের নগাঁও জেলার অন্তর্গত কালিয়াবরে ৬,৯৫০ কোটির বেশি টাকা ব্যয়ে প্রস্তাবিত নির্মীয়মাণ কাজিরঙা এলিভেটেড করিডর প্রকল্পের ভূমিপূজন এবং দুটি নতুন ‘অমৃত ভারত এক্সপ্রেস’ ট্রেনের শুভ সূচনা করে আয়োজিত দুই লক্ষাধিক জনতার সমাবেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন প্রধামমন্ত্রী মোদী। তিনি বলেন, কংগ্রেস সরকারের আমলে অবৈধ অভিবাসন ক্রমাগত বেড়েছে। যার ফলে বনভূমি, বন্যপ্রাণীর চলাচলের করিডর এবং রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলি ব্যাপকহারে বেদখলকারীদের কবলে চলে গিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে অসমের পরিচয় ও সংস্কৃতি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসমের পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষা করতে বিজেপি সরকার অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করছে। কংগ্রেস সরকার অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। যার ফলে সরকারি জমি ও অভয়ারণ্যে আগ্রাসন বেড়েছিল এবং অসমের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধ্বংসের মুখে পড়েছিল।

সতর্ক করে মোদী বলেন, ‘অনুপ্রবেশ কেবল আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় সমস্যা। অনুপ্রবেশকারীরা অসম এবং গোটা দেশের জন্য বড় হুমকি। কংগ্রেস ইতিবাচক নয়, নেতিবাচক রাজনীতি করে। তাই আপনাদের কংগ্রেস থেকে সতর্ক থাকতে হবে।’

মোদী বলেন, গত এক-দেড় বছরে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজেপির প্রতি আকর্ষণ বেড়েছে। বলেন, উন্নয়নের কোনও স্পষ্ট কর্মসূচি না থাকায় কংগ্রেস জনগণের আস্থা হারিয়েছে, দেশের মানুষের বিশ্বাস হারিয়েছে। কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, কংগ্রেসের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। যে কংগ্রেসের জন্ম মুম্বইয়ে হয়েছিল, সেখানে আজ এই দল পঞ্চম স্থানে নেমে গেছে।

মহারাষ্ট্রের পুরনিগম নির্বাচনের প্ৰসঙ্গও আজ অসমের জনসভায় টেনেছেন মোদী। বলেন জয় হয়েছে মহারাষ্ট্রে, আর বিজয়োৎসব পালন হচ্ছে কাজিরঙায়। মোদী বলেন, মুম্বই পুরনিগমে প্রথমবারের মতো বিজেপি ঐতিহাসিক জনাদেশ পেয়েছে। এছাড়া কেরালায়ও বিজেপির প্রসার ঘটেছে। থিরুবনন্তপুরমে বিজেপির মেয়র নির্বাচিত হওয়াকে তিনি তার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপিকে প্রধান শক্তি হিসেবে তুলে ধরে মোদী বলেন, এখন দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপিই মানুষের প্রথম পছন্দ। তিনি বলেন, মানুষ বিজেপির ওপর আস্থা রাখছে কেবল সুশাসন ও উন্নয়নের জন্য। বিহারের প্রসঙ্গ টেনে মোদী বলেন, দুই দশক ক্ষমতায় থাকার পরও বিজেপি সেখানে রেকর্ড জনাদেশ পেয়েছে।

অসমের প্রকৃতিপ্রেমীদের সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, ভারতে এখন প্রকৃতি এবং প্রগতি সমান্তরালভাবে চলছে। অথচ এমন এক দিন ছিল, যখন প্রকৃতি ও প্রগতি একসঙ্গে এগোতে পারে না বলে জনমনে বিকৃত ধারণার সৃষ্টি করা হয়েছিল। বিজেপি এই ন্যারেটিভ বিশ্বাস না করে এগিয়ে যাওয়ায় আজ তা ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে।

বিশাল সমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে কাজিরঙা অঞ্চলে গণ্ডার শিকারের ঘটনা নিয়মে পরিণত হয়েছিল। তিনি বলেন, অসম সরকার কাজিরঙাকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৩-১৪ সালে কাজিরঙায় এক ডজনের বেশি এক শৃঙ্গের গণ্ডার শিকার হয়েছে। প্রায় প্রতিদিন একাধিক গণ্ডার শিকারের খবর পাওয়া যেত। তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। পরিকাঠামোর উন্নয়ন সহ বন সুরক্ষা বাহিনী গঠন করে গণ্ডার সংরক্ষণ কৌশল নিয়েছে। গ্রাউন্ড লেভেলে সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে বিজেপি সরকার। রাজ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে গণ্ডার শিকারের সংখ্যা দ্রুতগতিতে কমতে থাকে। গত বছর, ২০২৫ সালে কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানে শিকারিদের হাতে একটিও গণ্ডার শিকার হয়নি, এই সংখ্যা জিরো।’ এই সাফল্যের কৃতিত্ব বিজেপি সরকারের ধারাবাহিক ও লক্ষ্যভিত্তিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টাকে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকৃতিকে রক্ষা করলে তা সুযোগও সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ স্থানীয় মানুষের জীবিকা উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

মোদী বলেন, অসমের ইতিহাসে কলিয়াবর একটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে স্বীকৃত। এখান থেকেই বীর সেনানী লাচিত বড়ফুকন মোঘল সম্রাটদের বিতাড়িত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। এখান থেকেই মোঘলদের সঙ্গে যুদ্ধের রণকৌশল রচনা করেছিলেন লাচিত। এই কলিয়াবর দিয়েই কাজিরঙায় প্রবেশের প্রধান পরিবেশবান্ধব দ্বার শুরু হয়েছে। তাই কলিয়াবরের গুরুত্ব বিবেচনা করে বিজেপি সরকার একে উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। এই অঞ্চল যোগাযোগ এবং বিকাশের অন্যতম কেন্দ্র হচ্ছে দেখে তিনি আনন্দিত বলে প্রধানমন্ত্রী জানান, অসম হলো বীর-বীরাঙ্গনাদের প্রদেশ। তাই নানা কারণে অসম তথা দেশের ইতিহাসে কলিয়াবরের স্থান বহু গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কাজিরঙা ও আশপাশ এলাকায় পর্যটনের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। এর ফলে হোম-স্টে, হস্তশিল্প, ছোট ব্যবসা এবং গাইড সহ বিভিন্ন পর্যটন-সংক্রান্ত পরিষেবার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। তিনি বন্যপ্রাণী সুরক্ষা জোরদার ও টেকসই পর্যটন উন্নয়নে অসম সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, সংরক্ষণ উদ্যোগগুলি একদিকে যেমন প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করছে, তেমনি অর্থনৈতিক সুযোগও সৃষ্টি করছে।

ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল কাজিরঙা জাতীয় উদ্যান একশৃঙ্গ গণ্ডারের বিশাল জনসংখ্যার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত এবং এটি অসমের ইকো-ট্যুরিজম খাতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ, বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাই কাজিরঙা ও তার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ শুধু বর্তমানের জন্য নয়, অসমের ভবিষ্যৎ ও আগামী প্রজন্মের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি জোর দেন।

কলিয়াবরে আজ ৬,৯৫০ কোটির বেশি টাকা ব্যয়ে প্রস্তাবিত নির্মীয়মাণ কাজিরঙা এলিভেটেড করিডর প্রকল্প প্ৰসঙ্গে প্ৰধানমন্ত্ৰী বলেন, এই প্রকল্পের ফলে ৩৭ নম্বর জাতীয় সড়কে দুর্ঘটনা কমবে এবং মধ্য ও উজান অসমের মধ্যে যোগাযোগ আরও উন্নত হবে। বন্যার সময় কাজিরঙার বন্যপ্রাণীরা খুব বেশি সমস্যার মুখে পড়ে। তাই মানুষ ও বন্যপ্রাণী – উভয়ের সুরক্ষার কথা ভেবে এলিভেটেড করিডর (জাতীয় সড়কের ওপর দিয়ে সেতু) তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেতুটি নির্মাণ হয়ে গেলে, তার ওপর দিয়ে যানবাহন যাতায়াত করবে আর নীচের রাস্তায় সুরক্ষিতভাবে চলাচল করবে বন্যপ্রাণী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের জৈব-বৈচিত্র্যের মূল্যবান রত্ন কাজিরঙা। কাজিরঙা কেবল জাতীয় উদ্যান নয়, অসমের আত্মা। কাজিরঙার মনোরম নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুধাকণ্ঠ ভারতরত্ন ড. ভূপেন হাজরিকার একটি গানের দু-পঙক্তি ‘আমার কাজিরঙা আমার পুণ্য অসমীয়ার কাজিরাঙা কেবল রাষ্ট্ৰীয় উদ্যানেই নহয়, অসমর আত্মা (আমাদের কাজিরঙা, আমাদের পুণ্য অসমবাসীর কাজিরঙা, এটি শুধু একটি জাতীয় উদ্যান নয়, এটি অসমের আত্মা) তাঁর বক্তব্যে উপস্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশজুড়ে ২৬০ কোটির বেশি গাছের চারা রোপণ করে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার কাজ করা হয়েছে। বিজেপি দেখিয়ে দিয়েছে, উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকৃতি সংরক্ষণও সম্ভব। ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার উত্তরপূর্ব ভারতের দ্রুত উন্নয়ন ঘটিয়েছে, যা কংগ্রেস সরকার কখনও করতে পারেনি। কংগ্রেস সরকার অসমকে যেখানে মাত্র ২ হাজার কোটি টাকা দিয়েছিল, সেখানে বিজেপি সরকার দিয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। কংগ্রেস উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে অবহেলা করত বলে অভিযোগ করেছেন মোদী। তিনি বলেন, নর্থ-ইস্ট এখন আর দূরে নয়, দিল্লির খুব কাছে।

গতকাল সন্ধ্যায় গুয়াহাটিতে বড়ো জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রায় দশ হাজার শিল্পীর সম্মিলিত ‘বাগুরুম্বা দহৌ’ নৃত্যের প্রসঙ্গও আজকের সমাবেশে তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাগুরুম্বা দহৌ’ তাঁর অন্তরে স্পর্শ করেছে। অত্যন্ত সুন্দরভাবে বাগুরুম্বা নৃত্য পরিবেশন করার জন্য শিল্পীদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিপুল পরিশ্রমের মাধ্যমে এত সুন্দরভাবে নৃত্য পরিবেশন করা হয়েছে যে তা একটি নতুন রেকর্ড গড়তে সক্ষম হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গত বছর ঝুমুইর নৃত্যে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এবার বাগুরুম্বা নৃত্যে। পাশাপাশি তিনি জানান, গত বছর নামরূপ সার কারখানা উদ্বোধন করা হয়েছে এবং গুয়াহাটিতে লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলৈ আন্তর্জাতিক বিমাবন্দরে নতুন টার্মিনাল ভবনের উদ্বোধন করেছেন।

অনুষ্ঠানে ভাষণ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল। ছিলেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্ঘেরিটা, রাজ্যের প্রায় সব মন্ত্রী-বিধায়ক এবং বিজেপির বিভিন্ন পদমর্যাদার নেতা-কার্যকর্তা এবং সমর্থক।

হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস




 

 rajesh pande