
গুয়াহাটি, ৩১ মাৰ্চ (হি.স.) : বন্যামুক্ত অসম, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, দুই লক্ষ সরকারি চাকরি, অবৈধ দখলকারীদের কবল থেকে ভূমি উদ্ধার, অসমের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাভিমান রক্ষা করা, গ্রিনফিল্ড শিলিগুড়ি-শিলং-শিলচর এক্সপ্রেসওয়ে, ব্রহ্মপুত্র নদের তলা দিয়ে গহপুর-নুমলিগড় রোড-কাম-রেল টানেল, গুয়াহাটি রিং রোড, ডিব্রুগড় হয়ে গুয়াহাটি-তিনসুকিয়া এক্সপ্রেসওয়ে, ডিব্রুগড়কে রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী ইত্যাদি ৩১টি উন্নয়ন সংক্রান্ত অঙ্গীকার সংবলিত বিজেপির নিৰ্বাচনী ইস্তাহার ‘সংকল্পপত্র’ প্রকাশ করেছেন দলের সর্বভারতীয় নেত্রী তথা কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ।
আজ মঙ্গলবার সকালে দলের অসম প্রদেশ সদর দফতর অটলবিহারী বাজপেয়ী ভবনে প্রদেশ সভাপতি দিলীপ শইকিয়া, মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল, কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্ঘেরিটা, অসম বিজেপির নির্বাচন প্রভারী ও সাংসদ বৈজয়ন্তজয় পাণ্ডা, প্ৰদেশ সাধারণ সম্পাদক অনুপ বৰ্মণ, মন্ত্রী ডা. রণোজ পেগু, মন্ত্রী রঞ্জিতকুমার দাস, সাংসদ তথা বিজেপির নিৰ্বাচন প্ৰবন্ধন সমিতির আহ্বায়ক প্রদান বরুয়াকে সঙ্গে নিয়ে ৮০ পৃষ্ঠার নির্বাচনী ইস্তাহার ‘সংকল্পপত্র’ প্রকাশ করেছেন দলের সর্বভারতীয় নেত্ৰী নির্মলা সীতারমণ। ‘সংকল্পপত্র’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে অসমীয়া পরম্পরা মুগা সুতোয় তৈরি মেখলা-চাদর পরেছিলেন নির্মলা।
২০২৬ সালের অসম বিধানসভা নির্বাচনে তৃতীয়বার ক্ষমতায় এলে আগামী পাঁচ বছরে যে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে তার এক তালিকা প্রকাশ করেছে বিজেপি। অসমজুড়ে ২.৪৫ লক্ষ জনসাধারণের মতামত নিয়ে তৈরি ৩১টি অঙ্গীকার সংবলিত ইস্তাহার ‘সংকল্পপত্র’-এর শুরুতেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পরিচয় ও অভিবাসন (অনুপ্রবেশ) ইস্যুকে। বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ১৯৫০ সালের ইমিগ্ৰ্যান্ট (এক্সপালশন ফ্ৰম আসাম) আইন কার্যকর করে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত ও বহিষ্কার দ্রুততর করা, দখলকৃত জমি উদ্ধার করা এবং মিশন বসুন্ধরা-র মাধ্যমে প্রকৃত নাগরিকদের জমির অধিকার প্রদান করা। এছাড়া সত্ৰ, নামঘর ও দেবালয়ের জমি দখলমুক্ত করা এবং ঐতিহ্যবাহী স্থানের উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে ‘সংকল্পপত্র’-এ।
আইনি ক্ষেত্রে দল ষষ্ঠ তফশিল এলাকা এবং জনজাতিদের বাইরে রেখে ইউনিফর্ম সিভিল কোড বাস্তবায়নের কথা বলেছে দল। পাশাপাশি ‘লাভ জিহাদ’ ও ‘ভূমি জিহাদ’ (ল্যান্ড জিহাদ) রোধে পৃথক আইন আনার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
পরিকাঠামো উন্নয়নে বড়সড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে ‘সংকল্পপত্র’-এ। ‘অসম গতি শক্তি মহাপরিকল্পনা’র অধীনে অসমকে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার (‘ইস্টার্ন গেটওয়ে’) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ৫ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি।
এছাড়া গুয়াহাটি-ডিব্রুগড়, গুয়াহাটি-আগরতলা এবং গুয়াহাটি-উত্তর লখিমপুর রুটে নতুন বন্দে ভারত ট্রেনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নতুন এক্সপ্রেসওয়ে যেমন গ্রিনফিল্ড শিলিগুড়ি-শিলং-শিলচর এক্সপ্রেসওয়ে, ডিব্রুগড় হয়ে গুয়াহাটি-তিনসুকিয়া এক্সপ্রেসওয়ে, ব্রহ্মপুত্রের তলা দিয়ে গহপুর-নুমলিগড় রোড-কাম-রেল টানেল, গুয়াহাটি রিং রোড, ডিব্রুগড়কে রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী গড়ে তোলা, মানস, উমরাংসো, চড়াইদেও, ডিফু, মাজুলি এবং কাছাড়ের ডলুর জন্য গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
গুয়াহাটি, ডিব্রুগড় ও তেজপুরে একটি ওয়াটার মেট্রো ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি বগিবিল, পাণ্ডু এবং যোগীঘোপায় সমন্বিত নদী সরবরাহ কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইস্তাহারে।
বন্যা সমস্যার সমাধানে ‘বাঁধ মুক্ত অসম মিশন’ চালু করার ঘোষণা করা হয়েছে। এর জন্য বরাদ্দ করা হবে ১৮ হাজার কোটির বেশি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাঁধ পুনর্নির্মাণের জন্য নদী পুনরুজ্জীবন মিশন, জাতীয় জলপথ-২-এর পদ্ধতিগত ড্রেজিং এবং বাঁধ পর্যবেক্ষণের জন্য যুব স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে ‘বাধ নিরক্ষক বাহিনী’ গঠন।
চাকরির ক্ষেত্রে দুলক্ষ সরকারি চাকরি দেওয়ার পাশাপাশি ‘আত্মনির্ভর অসম অভিযান’-এর মাধ্যমে ১০ লক্ষ যুবক-যুবতীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। নতুন স্নাতকদের জন্য ২৫ হাজার টাকার ‘জীবন প্রেরণা’ স্কিম এবং নতুন শিল্পে কর্মসংস্থানের জন্য ভরতুকিও দেওয়া হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে দরিদ্রদের জন্য কিন্ডারগার্টেন থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, এক হাজারটি স্কুল উন্নয়ন এবং ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি ছাড়াও একটি বিশ্বমানের ‘এডুকেশন সিটি’ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে ‘সংকল্পপত্র’-এ।
মহিলাদের জন্য ‘অরুণোদয়’ প্রকল্পের ভাতা ধাপে ধাপে তিন হাজার (৩,০০০) টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হবে এবং আরও ১৫ লক্ষ পরিবারকে এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া প্রতিটি জেলা সদরে মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত ‘আইর পাকঘর’ (মায়ের রান্নাঘর) স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি।
এছাড়া 'প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা'র অধীনে নতুন আরও ১৫ লক্ষ পাকা ঘর নিৰ্মাণের পাশাপাশি অন্যান্য মৌলিক সুবিধা প্রদান করার কথাও সংকল্পপত্র-এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি।
'বন অধিকার আইন, ২০০৬' সম্পূৰ্ণরূপে কার্যকর করে জনজাতীয় এবং খিলঞ্জিয়া (ভূমিপুত্র)-দের ভূমির সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। চা শ্রমিক সম্প্রদায়ের জন্য দৈনিক মজুরি ধাপে ধাপে ৫০০ টাকা করা, জমির পাট্টা প্রদান এবং আবাসন সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
‘সংকল্পপত্র’-এ আরও বলা হয়েছে, ছয় জনগোষ্ঠী যথাক্রমে কোচ-রাজবংশী, তাই-আহোম, চুতিয়া, মরান, মটক এবং চা উপজাতিকে তফশিলি জনজাতি (এসটি)-র মর্যাদা প্রদান করা এবং মিসিং, রাভা ও দেউরি, সনোয়াল কছারি, ঠেঙাল কছারি, তিওয়া এবং বড়ো কছারি স্বশাসিত পরিষদকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া হবে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আরও সাতটি সম্প্রদায়কে সুপারিশ করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে সংকল্পপত্রে।
স্বাস্থ্য খাতে ৫০ হাজার কোটি টাকার ‘অসম স্বাস্থ্য উৎকর্ষ অভিযান’ চালু করা এবং ক্যানসার চিকিৎসায় প্রোটন থেরাপি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে দলের।
অর্থনীতিকে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৩৬ সালের মধ্যে ৩০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, অসম প্রদেশ বিজেপির ‘সংকল্পপত্ৰ’ তৈরি করতে রঞ্জিতকুমার দাস ও ডা. রণোজ পেগুকে আহ্বায়ক এবং পবিত্ৰ মাৰ্ঘেরিটাকে সদস্যসচিব মনোনীতি করে একটি সমিতি গঠন করা হয়েছিল। এছাড়া সমিতির সদস্য হিসবে ছিলেন অজন্তা নেওগ, বিমল বরা, দিপ্লুরঞ্জন শৰ্মা, রামেশ্বর তেলি, অমরসিং তিসো, মিশনরঞ্জন দাস, ধ্ৰুবপ্ৰসাদ বৈশ্য, দ্বিজেন শৰ্মা, ড. প্ৰদীপ ঠাকুরিয়া, উদয়শংকর গোস্বামী, ড. কঙ্কনা গোস্বামী প্রমুখ।
সংকল্পপত্ৰ-এ রয়েছে ইউপিএ সরকার এবং এনডিএ সরকারের কাজকর্মের খতিয়ান। এতে পরিবৰ্তনের স্পষ্ট একটি চিত্ৰ তুলে ধরার চেষ্টা করেছে বিজেপি। সংকল্পপত্র-এর শুরুতে রয়েছে মুখ্যমন্ত্ৰী হিমন্তবিশ্ব শর্মার বাৰ্তা, প্রদেশ সভাপতি দিলীপ শইকিয়ার বাৰ্তা। উল্লেখ করা হয়েছে বিজেপির ১০ বছর, বিকাশের ১০ বছরের খতিয়ান।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস