
কলকাতা/পশ্চিম মেদিনীপুর, ১০ এপ্রিল (হি.স.) : ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে শুক্রবার কলকাতায় বিজেপির নির্বাচনী ইস্তাহার বা ‘সঙ্কল্প পত্র’ প্রকাশ করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এদিন বিকেলে ইস্তাহার প্রকাশের পাশাপাশি পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরা বিধানসভা কেন্দ্রে এক বিশাল জনসভাতেও অংশ নেন তিনি। ‘সঙ্কল্প পত্র’ প্রকাশের মঞ্চ থেকে এবং ডেবরা বিজয় সংকল্প সভা— উভয় ক্ষেত্র থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানিয়ে রাজ্যে পরিবর্তনের ডাক দেন শাহ।
শুক্রবার দুপুরে কলকাতার একটি অনুষ্ঠানে বিজেপির নির্বাচনী রূপরেখা বা ‘সঙ্কল্প পত্র’ উন্মোচন করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনে বাংলার মানুষ আজ ভীত, সন্ত্রস্ত ও হতাশ। মানুষ এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাইছেন। শাহ বলেন, মমতা দিদি ভয়, দুর্নীতি এবং বিভাজনের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু বিজেপি আইনের শাসন ও ভরসার পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে। বাংলার মানুষ বাম আমল থেকে মুক্তি পেতে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিল, কিন্তু তারা কেবল জবরদস্তি ও অনুপ্রবেশের শাসন দেখেছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে 'সোনার বাংলা' গড়ে তোলা এবং রাজ্যের পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
বিজেপির এই ইশতেহারে মূলত কর্মসংস্থান, নারী নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন এবং অনুপ্রবেশ দমনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। অনুপ্রবেশ রুখতে বিজেপি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করবে এবং ‘ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নারী ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে রাজ্যের প্রতিটি মহিলার অ্যাকাউন্টে মাসে ৩০০০ টাকা করে দেওয়া এবং সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সুরক্ষার জন্য তৈরি হবে বিশেষ ‘দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড’। বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত মাসে ৩০০০ টাকা ভাতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন শাহ। এ ছাড়া রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য সপ্তম পে কমিশন কার্যকর করা এবং বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে ইস্তাহার। কৃষি ও মৎস্য উন্নয়নে বিশেষ প্যাকেজ, চা ও পাটশিল্পের আধুনিকীকরণ এবং কুড়মালি ও রাজবংশী ভাষাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার মতো জনমোহিনী বিষয়গুলোও এই সঙ্কল্প পত্রে স্থান পেয়েছে।
সঙ্কল্প পত্র প্রকাশের পর পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরা বিধানসভা কেন্দ্রের অকালপৌষ প্রাইমারি স্কুল মাঠের ‘বিজয় সংকল্প সভা’য় যোগ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখান থেকে তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেন। অমিত শাহ বলেন, ১৫ বছর ধরে বাংলা তৃণমূলের অত্যাচার সহ্য করেছে। অনুপ্রবেশকারীরা এ রাজ্যের যুবকদের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে এবং গুন্ডাগিরি করছে। বিজেপি জিতলে প্রতিটি অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে দেশ থেকে বের করা হবে। তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে আক্রমণ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, ভাইপো মুখ্যমন্ত্রী হলে কি অনুপ্রবেশ বা দুর্নীতি আটকাতে পারবেন? তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের জন্য ১৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করার পরিকল্পনা করলেও রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে বিজেপি ক্ষমতায় এলে এক বছরের মধ্যে এই মাস্টারপ্ল্যান কার্যকর করার আশ্বাস দেন তিনি।
অমিত শাহ এদিন দাবি করেন যে, বিগত কয়েক বছরে বিজেপি রাজ্যে নিজেদের প্রধান বিশ্বাসযোগ্য বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত মোদী সরকার যা স্বপ্ন দেখিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, ২০২৬-এর নির্বাচনে বাংলার মানুষ বিজেপিকে অন্তত পাঁচ বছরের জন্য সরকার গড়ার সুযোগ দেবে। বিজেপির এই হাই-প্রোফাইল ইস্তাহার প্রকাশ এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঝোড়ো প্রচার কর্মসূচি নির্বাচনের আগে রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ‘সঙ্কল্প পত্রে’র এই সামাজিক ও আর্থিক প্রতিশ্রুতিগুলো শাসক দল তৃণমূলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি