
কলকাতা, ১১ এপ্রিল (হি. স.): গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের আগে প্রচারের ধরণ ও কৌশলে আমূল পরিবর্তন এসেছে। একটা সময় ছিল যখন ভোটের প্রচার মানেই ছিল পাড়ায় পাড়ায় দেওয়াল লিখন, রাজপথে বিশাল জনসভা, কিংবা মাইকের কানফাটানো আওয়াজ। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই পরিচিত ছবিটা এখন অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। জনসভা বা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগের গুরুত্ব কমেনি ঠিকই, তবে বর্তমানে সভা-সমাবেশ বা ব্যানার-পোস্টারকেও ছাপিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার অন্যতম প্রধান এবং শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে উঠে এসেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
আধুনিক যুগের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ফেসবুক, এক্স হ্যান্ডেল, ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো মাধ্যমগুলি এখন রাজনীতির নতুন ময়দান। প্রার্থীরা তাঁদের দলীয় আদর্শ, নির্বাচনী ইস্তেহার এবং উন্নয়নমূলক বার্তা নিয়ে নিমেষের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছেন কোটি কোটি ভোটারের ড্রয়িং রুমে। আগে যেখানে একটি জনসভা করতে বিপুল আয়োজন আর সময়ের প্রয়োজন হতো, এখন একটি 'ফেসবুক লাইভ' বা 'ইনস্টাগ্রাম রিলস'-এর মাধ্যমেই প্রার্থীরা সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারছেন। এই ডিজিটাল বিপ্লব নির্বাচনী প্রচারের ধারণাকেই কার্যত বদলে দিয়েছে।
১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী নতুন প্রজন্মের ভোটারদের সিংহভাগই তাঁদের দিনের অনেকটা সময় কাটান স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। এই বিশাল সংখ্যক তরুণ ভোটব্যাঙ্ককে প্রভাবিত করতে রাজনৈতিক দলগুলি এখন আইটি সেল বা তথ্যপ্রযুক্তি শাখা তৈরি করেছে। চটকদার গ্রাফিক্স, ছোট ভিডিও ক্লিপ এবং মিমের মাধ্যমে তরুণদের মন জয় করার চেষ্টা চলছে। ফলে রাজনৈতিক বিতর্ক এখন সরাসরি চলে এসেছে কমেন্ট বক্সে।
সামাজিক মাধ্যমের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি দ্বিমুখী যোগাযোগের সুযোগ করে দেয়। জনসভায় নেতা কেবল ভাষণ দিয়ে যান, কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে ভোটাররা সরাসরি প্রশ্ন করতে পারেন, মতামত দিতে পারেন বা কোনো বিষয়ে তাঁদের আপত্তির কথা জানাতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলি এই মিথস্ক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে জনগণের নাড়ির স্পন্দন বোঝার চেষ্টা করছে। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুক স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে প্রার্থীরা নিজেদের মানবিক দিকটি তুলে ধরে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
তবে সামাজিক মাধ্যমের এই ব্যাপক ব্যবহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে 'ফেক নিউজ' বা ভুয়ো খবরের আতঙ্ক। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অনেক সময় বিকৃত ছবি বা ভিডিও ভাইরাল করা হয়, যা সাম্প্রদায়িক বা সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে। গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার প্রতিযোগিতা অনেক সময়ই নজরে আসে। এই ধরণের ডিজিটাল অপপ্রচার রোধ করা প্রশাসনের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমের গুরুত্ব বুঝে নির্বাচন কমিশনও এখন অত্যন্ত সতর্ক। অনলাইন বিজ্ঞাপনের খরচ এখন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি, উস্কানিমূলক পোস্ট বা ভুয়ো খবরের ওপর কড়া নজরদারি চালানোর জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষক দল নিয়োগ করা হচ্ছে। কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচার চালানোর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
পরিশেষে বলা যায়, আগামীর রাজনীতি যে পুরোপুরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নির্ভর হতে চলেছে—তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সামাজিক মাধ্যম যেমন রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, ঠিক তেমনই এর অপব্যবহার রোধ করাটাও সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য সমানভাবে জরুরি। প্রযুক্তির এই সঠিক মেলবন্ধনই পারে একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক নির্বাচনী পরিবেশ উপহার দিতে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি