
কলকাতা, ১১ এপ্রিল ( হি. স.) : লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে শনিবার উত্তর থেকে দক্ষিণ—পুরো পশ্চিমবঙ্গ চষে বেড়ালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া, দক্ষিণ দিনাজপুরের কুশমণ্ডি এবং মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরের জনসভা থেকে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে তিনি দাবি করেন, গত ১৫ বছরের অপশাসন বাংলায় কেবল ভয় এবং দুর্নীতি উপহার দিয়েছে। পরিবর্তনের ডাক দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দেন যে, তৃণমূলের ভয়ের রাজত্ব এবার শেষ হতে চলেছে এবং বাংলার মানুষ এবার আস্থার নতুন সূর্য দেখতে পাবেন। তিনি আরও বলেন যে, এই নির্বাচন কেবল সরকার গড়ার নয়, বরং তৃণমূলের নির্মম শাসনের হাত থেকে বাংলার মানুষকে মুক্ত করার লড়াই।
কাটোয়া ও কুশমণ্ডির সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনকাল বাংলার প্রতিটি পরিবারকে আতঙ্কিত করে রেখেছে। বাম আমলের গুন্ডা ও সিন্ডিকেট রাজ এখন তৃণমূলে মিশে গিয়ে বাংলাকে রসাতলে পাঠিয়েছে। আর জি কর হাসপাতালের নৃশংস ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মোদী বলেন যে, যখন এক চিকিৎসক কন্যার ওপর অবিচার করা হলো, তখন মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমেছিল। তিনি নিশ্চয়তা দেন যে, মেয়েদের প্রতি সংঘটিত প্রতিটি অপরাধের ফাইল পুনরায় খোলা হবে এবং অপরাধীদের আড়ালকারীদের কাউকেও রেয়াত করা হবে না। তৃণমূলকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে কোনো প্রকল্প বন্ধ হবে না, বরং বন্ধ হবে তৃণমূলের দুর্নীতির দোকান আর লুটের কারবার।
বাংলার মানুষের জন্য একগুচ্ছ নিশ্চয়তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান যে, কৃষকরা ডাবল ইঞ্জিন সরকারের সৌজন্যে পিএম কিষাণ নিধির মাধ্যমে বছরে ৯,০০০ টাকা পাবেন। এর পাশাপাশি মহিলাদের সুরক্ষার গ্যারান্টি দেওয়ার পাশাপাশি মাসিক ৩,০০০ টাকা করে অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সরকারি কর্মচারীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন যে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন হওয়া মাত্রই সপ্তম বেতন কমিশনের সুবিধা কার্যকর করা হবে এবং প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই আয়ুষ্মান ভারত যোজনা অনুমোদন পাবে। অনুপ্রবেশ সমস্যা নিয়ে কাটোয়ার সভা থেকে মোদী অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিয়ে জানান, যারা অবৈধভাবে ভারতে ঢুকে জাল নথির মাধ্যমে সুবিধা নিচ্ছে, তাদের জবাবদিহি করতে হবে। পাশাপাশি মতুয়া ও নমশূদ্র শরণার্থীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন যে, বিজেপি সরকার সিএএ আইনের মাধ্যমে দ্রুত তাঁদের নাগরিকত্ব প্রদানের কাজ সম্পন্ন করবে।
মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, বিজেপির কাছে দেশের নিরাপত্তা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। বাংলায় তোষণ-রাজনীতির চিরতরে অবসান ঘটাতে বিজেপি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি কার্যকর করতে বদ্ধপরিকর। তাঁর মতে, ব্রিটিশ, কংগ্রেস বা বামপন্থী—যারাই বাংলার সামনে দম্ভ দেখিয়েছে, তাদের দম্ভ ধূলিসাৎ হয়েছে এবং এবার বাংলার মানুষ তৃণমূলের অহংকার চূর্ণ করে দেবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, সন্দেশখালি থেকে আর জি কর—প্রতিটি ঘটনায় সরকার নির্লজ্জভাবে অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করেছে। তৃণমূলের এই দুর্নীতির মডেল বাংলাকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
নির্বাচনী জনসভাগুলোর পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে উন্মাদনা তুঙ্গে। শনিবার কুশমণ্ডির সভা শেষে বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছে শিলিগুড়িতে একটি বর্ণাঢ্য রোড শো করার কথা রয়েছে তাঁর। বিহার মোড় থেকে স্টেশন মোড় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই কর্মসূচির জন্য শিলিগুড়ি মেট্রোপলিটন পুলিশ নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। যানজট এড়াতে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান রাস্তাগুলোতে ভারী যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির প্রার্থী আনন্দময় বর্মন জানিয়েছেন, এই রোড শো ঐতিহাসিক হতে চলেছে এবং সাধারণ মানুষ যাতে প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখতে পান, সেজন্য কনভয় অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোবে। সব মিলিয়ে, শনিবারের এই ঝোড়ো প্রচারের মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদী বাংলায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ডাক জোরালো করলেন।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি