

হাওড়া , ১০ জুন (হি.স.) : রাজ্যে আয়ুর্বেদ, যোগ, ইউনানি, সিদ্ধা এবং হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও গুরুত্ব দিতে স্বাস্থ্য দফতর থেকে পৃথক করে স্বতন্ত্র ‘আয়ুষ দফতর’ গঠনের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই ঘোষণার পর রাজ্যের বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক ও গবেষক মহলে আশার সঞ্চার হয়েছে। তাঁদের মতে, পৃথক দফতর গঠিত হলে আয়ুষের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতির প্রসার, গবেষণা এবং সরকারি স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে যেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে হাওড়ার মৌরিগ্রামে অবস্থিত ‘ইন্ডিয়ান রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড মেডিসিন’ (ইরিম)। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আকুপাংচার, যোগ ও নেচারোপ্যাথি নিয়ে চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার কাজ করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, আয়ুষকে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা হলে ইরিমের মতো প্রতিষ্ঠানের কাজ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
১৯৮১ সালে কলকাতার একটি ভাড়া বাড়িতে কয়েকজন আকুপাংচার চিকিৎসক ও গবেষকের উদ্যোগে ইরিমের পথচলা শুরু হয়। ভারতবর্ষে আকুপাংচার চিকিৎসার পথিকৃৎ চিকিৎসক বিজয়কুমার বসুর ছাত্রদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক দেবাশিস বক্সি। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠানটি হাওড়ার আন্দুলে স্থানান্তরিত হয় এবং ১৯৯৮ সালে মৌরিগ্রাম স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় বর্তমান ভবনে কার্যক্রম শুরু করে।
বর্তমানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও ভিনরাজ্য থেকে বহু রোগী চিকিৎসার জন্য এখানে আসেন। এখানকার চিকিৎসকদের দাবি, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, বাত, স্নায়ুরোগ, চর্মরোগ, অনিদ্রা, অ্যালার্জি ও বিভিন্ন জটিল সমস্যার চিকিৎসায় আকুপাংচার ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। ওষুধবিহীন এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে শরীরের নির্দিষ্ট পয়েন্টে সূক্ষ্ম স্টিলের সূচ প্রয়োগ করে স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করা হয়, যা শরীরের স্বাভাবিক আরোগ্য প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করতে সাহায্য করে। প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকদের বক্তব্য, বহু রোগী দীর্ঘদিন প্রচলিত চিকিৎসা করিয়েও উপশম না পেয়ে ইরিমে এসে সুফল পেয়েছেন। রোগীদের অভিজ্ঞতাও সেই দাবিকেই সমর্থন করে। কোমরের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা থেকে শুরু করে দুর্ঘটনাজনিত আঘাত— নানা সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
চিকিৎসক দেবাশিস বক্সির দাবি, আকুপাংচার বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি। ১৯৭৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই চিকিৎসা পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দেয় এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রোগে এর কার্যকারিতা সম্পর্কেও উল্লেখ করে। তাঁর মতে, ভারতে আকুপাংচারের পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্বীকৃতি এবং চিকিৎসা শিক্ষার পরিকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র আকুপাংচার হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত ইরিম শুধু চিকিৎসাই নয়, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এখানকার লাইব্রেরি এবং আকুপাংচার সংক্রান্ত আর্কাইভ দেশের মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বহু চিকিৎসক বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করছেন। আকুপাংচারের পাশাপাশি যোগ ও নেচারোপ্যাথির পৃথক বিভাগ রয়েছে এখানে। সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় এই যোগ ও নেচারোপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি।
আয়ুষের জন্য পৃথক দফতর গঠনের সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রসারে নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। সেই ক্ষেত্রে হাওড়ার মৌরিগ্রামের ইরিমের মতো প্রতিষ্ঠান রাজ্যের আয়ুষ পরিকাঠামোকে আরও সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলেই আশা চিকিৎসক ও গবেষকদের।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর ২১ জুন এখানে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালন হয় নিয়ম মেনে। তাতে অংশগ্রহণ করেন বহু মানুষ।যোগাভ্যাস সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা নেয় ‘ইন্ডিয়ান রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড মেডিসিন’ (ইরিম)।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সুনন্দা দাস