
তেলিয়ামুড়া (ত্রিপুরা), ১৩ জুন (হি.স.): খোয়াই জেলার তেলিয়ামুড়া মহকুমার চাকমাঘাট মুসলিম বস্তি এলাকায় মাটি ধসে দুই যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের দুর্যোগ মোকাবিলা দলের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘটনাস্থলে পৌঁছেও উদ্ধারকাজে সক্রিয় ভূমিকা না নিয়ে দলের সদস্যরা কার্যত দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন। অন্যদিকে অগ্নিনির্বাপক বাহিনী ও টিএসআর জওয়ানরাই উদ্ধার অভিযানের মূল দায়িত্ব পালন করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
শনিবার সকালে কৃষ্ণপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত চাকমাঘাট মুসলিম বস্তি এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, কুঞ্জমুড়া এলাকার বাসিন্দা ২০ বছর বয়সি জেমস জমাতিয়া, ৩০ বছর বয়সি আশা হরি জমাতিয়া এবং ৩০ বছর বয়সি অমূল্য ধন জমাতিয়া একটি গাড়ি নিয়ে বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাটি সংগ্রহ করতে সেখানে যান। মাটি কাটার সময় আচমকাই একটি বিশাল মাটির স্তূপ ধসে পড়ে তাঁদের উপর।
ঘটনা প্রত্যক্ষ করে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ছুটে আসেন এবং প্রশাসনের জন্য অপেক্ষা না করে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় অমূল্য ধন জমাতিয়াকে। তাঁর পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। প্রথমে তাঁকে তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে আগরতলায় জিবিপি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর প্রথমে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় অগ্নিনির্বাপক বাহিনী। পরে টিএসআর-এর জওয়ানরাও উদ্ধারকাজে যোগ দেন। কিন্তু মহকুমা প্রশাসনের দুর্যোগ মোকাবিলা দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে আরও প্রায় এক ঘণ্টা সময় নেয় বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরও তাঁদের কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি বলেও দাবি স্থানীয়দের।
ঘটনাস্থলের বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দুর্যোগ মোকাবিলা দলের সদস্যদের নিষ্ক্রিয় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে অগ্নিনির্বাপক কর্মী ও টিএসআর জওয়ানরা ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যান। পরবর্তীতে মাটির নিচ থেকে জেমস জমাতিয়া ও আশা হরি জমাতিয়াকে উদ্ধার করে তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁদের মৃত বলে ঘোষণা করেন।
খবর পেয়ে তেলিয়ামুড়া থানার পুলিশ হাসপাতালে পৌঁছে মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। ঘটনার পর নিহতদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
এদিকে, দুর্যোগ মোকাবিলা দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিএসএম জিনিয়াস দেববর্মা হাসপাতালে এসে মৃতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বললেও সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হননি বলে অভিযোগ। ফলে উদ্ধার অভিযানে দলের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে তেলিয়ামুড়া মহকুমা শাসক অপূর্ব কৃষ্ণ চক্রবর্তী হাসপাতালে এসে জানান, দুর্যোগ মোকাবিলা দলের সদস্যরা জেসিবি মেশিন পৌঁছানোর অপেক্ষায় ছিলেন। তবে এই ব্যাখ্যা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জেসিবি পৌঁছানোর আগেই টিএসআর ও অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে দুই যুবককে মাটির নিচ থেকে বের করে আনেন।
ঘটনার পর এলাকাজুড়ে প্রশাসনের প্রস্তুতি ও দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, সংকটময় মুহূর্তে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা যাদের, তাঁদের ভূমিকা হতাশাজনক ছিল। ফলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায়িত্ব নির্ধারণের দাবি উঠতে শুরু করেছে।
চাকমাঘাটের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় দুই যুবকের মৃত্যু এবং অপর এক যুবকের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় গোটা এলাকায় শোকের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। একইসঙ্গে উদ্ধার অভিযানে প্রশাসনিক সমন্বয় ও প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ