দুর্গাপুরে এনআইএ-র হানা, আন্তর্জাতিক ভুয়ো পাসপোর্ট ও মানব পাচার চক্রের অন্যতম অভিযুক্ত গ্রেফতার
দুর্গাপুর, ২৭ জুলাই (হি. স.) :কখনও টায়ারের দোকানে কাজ, আবার কখনও ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি—আর তার আড়ালেই চলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে ঠিকা শ্রমিক সরবরাহ। শুধু তাই নয়, কাজের নামে ঠিকা শ্রমিকদের সেসব দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভুয়ো পাসপোর্ট তৈরি করা হত
দুর্গাপুরে এনআইএ-র হানা, আন্তর্জাতিক ভুয়ো পাসপোর্ট ও মানব পাচার চক্রের অন্যতম অভিযুক্ত গ্রেফতার


দুর্গাপুর, ২৭ জুলাই (হি. স.) :কখনও টায়ারের দোকানে কাজ, আবার কখনও ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি—আর তার আড়ালেই চলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে ঠিকা শ্রমিক সরবরাহ। শুধু তাই নয়, কাজের নামে ঠিকা শ্রমিকদের সেসব দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভুয়ো পাসপোর্ট তৈরি করা হতো বলেও অভিযোগ। আর এই জাল পাসপোর্ট তৈরি করেই কাজের নামে শ্রমিকদের মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করা হতো। সোমবার সাতসকালে দুর্গাপুরের নিউ স্টিল পার্ক এলাকায় হানা দিয়ে এই চক্রের এক সদস্যকে গ্রেফতার করল এনআইএ । ঘটনাকে ঘিরে তুমুল শোরগোল শুরু হয়েছে শিল্পাঞ্চলজুড়ে। জানা গেছে, ধৃতের নাম গোলাম জামা। সে দুর্গাপুর মেনগেট সংলগ্ন নিউ স্টিল পার্ক এলাকায় থাকত। এদিন তাকে দুর্গাপুর আদালতে তোলা হলে বিচারক ধৃত গোলাম জামাকে ট্রানজিট রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

প্রসঙ্গত, গত কয়েক মাস ধরে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ জাল পাসপোর্ট তৈরি এবং মানব পাচারের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে এক বিশাল অভিযান চালাচ্ছে; যার আওতাভুক্ত রয়েছে ছত্তীসগড়, বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও দিল্লি। ট্রাভেল এজেন্সি এবং স্থানীয় সাব-এজেন্টদের আড়ালে সক্রিয় থাকা এই আন্তর্জাতিক চক্রগুলি সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে আসছিল। সূত্রে জানা গেছে, চক্রটি কম্বোডিয়া, লাওস ও থাইল্যান্ডের মতো দেশে মোটা বেতনের ভুয়ো চাকরির লোভ দেখিয়ে ভারতীয় যুবকদের পাচার করত। সেখানে নিয়ে গিয়ে তাঁদের আসল পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হতো এবং সাইবার অপরাধে কাজ করতে বাধ্য করা হতো বলে অভিযোগ। জাল নথির ব্যবহার করে চক্রটি বেআইনি অনুপ্রবেশকারী এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের ভুয়ো আধার, প্যান কার্ড এবং জাল ভারতীয় পাসপোর্ট তৈরি করে দেওয়ার কাজে লিপ্ত ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর আগে একাধিক রাজ্যে একযোগে তল্লাশি চালিয়ে এনআইএ ডিজিটাল ডিভাইস, বেশ কিছু জাল পাসপোর্ট ও ভুয়ো নিয়োগপত্র উদ্ধার করেছে।

সেই সূত্র ধরে সম্ভবত দিল্লি এনআইএ-র ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সোমবার সাতসকালে দুর্গাপুরের নিউ স্টিল পার্কে গোলাম জামার বাড়িতে হানা দেয়। গোলাম আদপে বিহারের মুজফফরপুরের বাসিন্দা। কয়েক বছর ধরে সে অণ্ডালে টায়ারের দোকানে কাজ করত। তার আগে ছত্তীসগঢ়ে ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করতে গিয়েছিল। সেখান থেকেই সম্ভবত বিদেশে ঠিকা শ্রমিক সরবরাহের নামে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয় সে। বছর চারেক আগে ছত্তীসগঢ় থেকে গোলাম দুর্গাপুরে চলে আসে। এখানে বিয়ে করে নিউ স্টিল পার্কে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে। তার দুই ছেলেও রয়েছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সেভাবে মিশত না গোলাম। তবে মাঝেমধ্যেই সে যে বিদেশে যেত—বিশেষত মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবে—তা জানা গেছে। কিন্তু ঠিক কী কারণে তার এই বিদেশে যাতায়াত, তা কেউ টের পাননি।

সোমবার সাতসকালে গোলাম জামার খোঁজে যখন এনআইএ-র টিম দুর্গাপুরে আসে, তখন আশপাশের লোকজনের সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। সালাউদ্দিন আনসারী নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আমরা শুনেছিলাম যে এই গোলাম জামা ছত্তীসগঢ়ে একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করত। সেখান থেকে ভুয়ো পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযান চলেছিল। তাতে কয়েকজন ধরা পড়েছিল শুনেছি। জানা গেছে, মাঝে সিম কার্ডও বদলে ফেলেছিল গোলাম।

এখন প্রশ্ন উঠছে, তবে কি জাল আধার ও পাসপোর্ট তৈরি করে হিউম্যান ট্রাফিকিংয়ের কাজ করত গোলাম? ভারত ছাড়াও বাংলাদেশ থেকেও কি মানব পাচার চক্রের যোগ রয়েছে? জাল পাসপোর্ট ও মানব পাচার ছাড়াও অন্য কোনো নাশকতার যোগ রয়েছে কি না—যদিও সেসবই এখন তদন্তসাপেক্ষ। তবে এদিন তার বাড়ি থেকে বেশ কিছু নথি বাজেয়াপ্ত করেছেন এনআইএ তদন্তকারীরা। টানা প্রায় তিন ঘণ্টা জেরা করার পর, মুখ ঢাকা অবস্থায় তাকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে গাড়িতে তোলেন তদন্তকারীরা।

দুর্গাপুর পশ্চিমের বিধায়ক লক্ষণ ঘড়ুই বলেন, সমগ্র শিল্পাঞ্চলে গত কয়েক বছরে নগরায়ন হয়েছে। রাজ্য ছাড়াও ভিন রাজ্য ও বিদেশ থেকে বহু লোকের সমাগম রয়েছে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে অনেকে ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। বিগত সরকারের আমলেও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অভিযানে অনেক বড় বড় অপরাধ চক্রের হদিশ পাওয়া গেছে। পূর্বের সরকারের উদাসীনতার কারণেই এসব অপরাধ চক্র রাজ্যে ঘাঁটি তৈরি করেছিল। পুলিশকে বলব, শহরের সমস্ত ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ করুক। দেশের সুরক্ষার স্বার্থে বাড়ি মালিকদেরও অনুরোধ করব, ভাড়াটিয়াদের তথ্য যেন পুলিশের কাছে জমা দেন।

হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা




 

 rajesh pande