মনসা পুজোয় মেতে বাঁকুড়া—রাজ্য সরকারের ছুটি ঘোষণায় খুশি দুই জেলা
বাঁকুড়া, ১৮ আগস্ট (হি. স.) : বাঁকুড়া-সহ রাঢ়বঙ্গ মেতে উঠেছে মনসা পুজোয়। রাঢ়ের এমন কোনও হিন্দু গ্রাম নেই, যেখানে মনসা পুজো হয় না। অনেকে আবার মনসাকে রাঢ়ের জাতীয় দেবী বলেও মনে করেন। রাঢ়ের মানুষের এই ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান রাজ্য সরকার বাঁকুড়া ও পু
মনসা পুজোয় মেতে বাঁকুড়া—রাজ্য সরকারের ছুটি ঘোষণায় খুশি দুই জেলা


বাঁকুড়া, ১৮ আগস্ট (হি. স.) : বাঁকুড়া-সহ রাঢ়বঙ্গ মেতে উঠেছে মনসা পুজোয়। রাঢ়ের এমন কোনও হিন্দু গ্রাম নেই, যেখানে মনসা পুজো হয় না। অনেকে আবার মনসাকে রাঢ়ের জাতীয় দেবী বলেও মনে করেন। রাঢ়ের মানুষের এই ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান রাজ্য সরকার বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় মনসা পুজোয় ছুটি ঘোষণা করেছে। মনসা পুজোকে কেন্দ্র করে এটাই প্রথম সরকারি ছুটি। সরকারের এই সিদ্ধান্তে খুশি বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার মানুষ।

বহু প্রাচীনকাল থেকেই রাঢ়ে দীর্ঘ সময় ধরে নানা রূপে, নানা নামে মনসা পুজো হয়ে আসছে। জ্যৈষ্ঠ মাসের দশহরার দিন থেকে আশ্বিন মাসের নলসংক্রান্তি, ডাকসংক্রান্তি বা জিহুড় পর্যন্ত এই পুজো চলে। অযোধ্যা বা জয়পুরের রাউৎখণ্ডে জগৎগৌরীর মেলা বসে, সেখানে লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম হয়। আষাঢ় মাসের পূর্ণিমার পর যে পঞ্চমী তিথি পড়ে, সেই নাগপঞ্চমীতেও রামসাগরে মনসা দেবীকে ঘিরে বড় মেলা বসে। সারা জেলাজুড়ে মনসা দেবীকে ঘিরে এমন অসংখ্য ছোট-বড় মেলা হয়।

তবে শ্রাবণ সংক্রান্তিতেই মনসা পুজোর চল সবচেয়ে বেশি। মনসা পুজোর দিন উৎসবে মেতে ওঠে গোটা জেলা। এর ফলে এতদিন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, হোটেল, মিষ্টি ও খাবারের দোকানগুলিও কর্মীদের ছুটির কারণে বন্ধ থাকত। যাত্রী না থাকায় বাস চলাচলও প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ত। এবার এই দিনটিতে রাজ্য সরকার ছুটি ঘোষণা করায় স্থানীয়দের মধ্যে খুশির হাওয়া। তাঁদের মতে, এতদিন মনসা পুজো ছিল কার্যত অঘোষিত ছুটির দিন, এবার তা সরকারি স্বীকৃতি পেল।

লোকসংস্কৃতিবিদদের মতে, দেবী মনসার পুজো অত্যন্ত প্রাচীন। বাঁকুড়া শহর সংলগ্ন এক্তেশ্বরের শিবমন্দিরকেও তার অন্যতম প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই মন্দিরে থাকা দ্বাদশভুজ বিষ্ণুমূর্তিকে অনেকেই বাসুকির মূর্তি বলে মনে করেন। লোকবিশ্বাসে সেখানে লৌকিক দেবী খাঁদারাণী ও মনসা দেবীর আরাধনা করা হয়।

জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বট, অশ্বত্থ, শাল, পিয়াল, নিম ও মহুয়া গাছের তলায় একসময় লৌকিক দেবী মনসার পুজো হত। সেই জায়গাগুলি ‘মা মনসার থান’ হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে সেখানে সিমেন্টের বাঁধানো চাতাল এবং আরও পরে মন্দির গড়ে ওঠে। জেলার বহু জায়গায় দেবী মনসার সুপ্রাচীন শিলামূর্তিও রয়েছে। বেশ কিছু এলাকায় মনসার চালি বা পোড়ামাটির বিশেষ মূর্তি পূজিত হয়।

পাঁচমুড়া-সহ জেলার বিভিন্ন কুমোরপাড়াও মনসা পুজোকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। জেলার বেশিরভাগ জায়গাতেই হাতি-ঘোড়াকে মনসার প্রতীক বা প্রিয় উপকরণ হিসেবে নৈবেদ্য দেওয়ার রীতি রয়েছে। ফলে পুজোকে ঘিরে কয়েক লক্ষ মাটির হাতি-ঘোড়ার প্রয়োজন হয়। বহু কুমোরবাড়িতে তৈরি হয় মাটির মনসার চালি। এই চালিও দেবী মনসা হিসেবে জনপ্রিয়। চালির উপরে থাকেন দেবসেনাপতি কার্তিক, নিচে রাধাকৃষ্ণ এবং মাঝে মা মনসা ও দুই পাশে দুই সখী।

মনসা পুজোয় মাটির নতুন ধুনুচি, মালসা, হাঁড়ি-কলসির চাহিদাও থাকে তুঙ্গে। ফলে মৃৎশিল্পীরাও এই উৎসবকে ঘিরে ব্যস্ত ও খুশি। মনসা পুজোকে কেন্দ্র করে লোকশিল্পীরাও মেতে ওঠেন মনসামঙ্গল পালা, মনসা যাত্রা, গান ও ঝাপানের আয়োজনে। বর্তমানে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনের কারণে সাপের খেলা দেখানো বন্ধ। বিষ্ণুপুর-সহ সারা জেলায় মল্লরাজ আমল থেকেই ঝাপান জনপ্রিয়।

জেলার অনেক জায়গায় ঘটে দেবী পদ্মার পুজোও হয়। রাঢ়ে মনসা পুজোয় হাঁস নিবেদন ও বলি দেওয়ারও সুপ্রাচীন রেওয়াজ রয়েছে। দুই জেলায় পুজোকে ঘিরে কয়েক লক্ষ হাঁসের চাহিদা তৈরি হয়। ফলে এদিন হাঁসের দামও বেড়ে যায়। বাঁকুড়া জেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামে মনসা পুজো ও শোভাযাত্রা হওয়ায় ঢাক-ঢোলের চাহিদাও থাকে তুঙ্গে।

সব মিলিয়ে মনসা পুজোয় মেতে উঠেছে বাঁকুড়া। তবে এবার রাঢ়ের মানুষের খুশির অন্যতম কারণ সরকারি ছুটি ঘোষণা। তাঁদের বক্তব্য, রাঢ়ের মানুষের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও আবেগকে সরকার যে গুরুত্ব দিয়েছে, তাতেই তাঁরা খুশি।

হিন্দুস্থান সমাচার / সোমনাথ বরাট




 

 rajesh pande