
দুর্গাপুর,২৭ আগস্ট (হি. স.): প্রযুক্তির যুগে আসক্ত হয়ে পড়েছে শিশুমন। তার জেরে কার্যত ভুলেই গিয়েছে খেলাধুলা থেকে রামায়ন, মহাভারতের ইতিহাস। শিশুমনে মোবাইলের আসক্তি দূর করতে নিজের সৃজনশীল শিল্পকলার মাধ্যমে ঝুলন উৎসবের উদ্যোগ নিলেন কাঁকসার বনকাটির স্কুল শিক্ষিকা গৃহবধূ। ছোট ছেলে মেয়েদের পৌরাণিক চরিত্র সাজিয়ে শ্বশুরবাড়ির গ্রামেই ঝুলনের মাধ্যমে রামায়ণ-মহাভারত ও পুরাণ কাহিনির পাঠ দিচ্ছেন গৃহবধূ সহেলি পাল। আর এই ঝুলন দেখতে উৎসাহী গ্রামবাসী।
হিন্দু ধর্মের, বিশেষত বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের প্রেমের উৎসব হল ঝুলন উৎসব। ঝুলন যাত্রা, যা ঝুলন পূর্ণিমা বা হিন্দোলা নামেও পরিচিত।
এই উৎসবে রাধা ও কৃষ্ণের মূর্তিগুলোকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে দোলনায় বসানো হয়। ভক্তিগীতি ও নৃত্যের মাধ্যমে তাঁদের পূজা করা হয়। অনেক জায়গায় ছোটো ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন পৌরানিক কাহিনির চরিত্রের রূপ দিয়ে সাজিয়ে ঝুলন উৎসব পালন করেন। মূলত সন্ধ্যার সময় বিশেষ মণ্ডপে এই ধরনের বিভিন্ন দেবদেবীর ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে সাজানো হয়। তার সঙ্গে থাকে আলোকসজ্জা।
কাঁকসার বনকাটি গ্রামে এরকমই মানুষ ঝুলনের উদ্যোগ নেন গৃহবধূ সহেলি পাল দত্ত। ২০২১ সাল থেকে বনকাটির মহাপ্রভু প্রাঙ্গণে মানুষ ঝুলন শুরু করেন। গ্রামের ছোট ছেলেমেয়েদের রামায়ম-মহাভারত সহ বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনির নানান প্রেক্ষাপটের নানান চরিত্রে সজ্জিত করেন নিজের হাতে। তার সঙ্গে মণ্ডপে মানানসই প্রেক্ষাপট থার্মোকল ও কাপড়ে রং তুলি দিয়ে ছবি আঁকেন। গৃহবধূ শিক্ষিকার
শিল্পকলায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন স্বামী উৎপল দত্ত ও গ্রামের যুবক তরুণ বাগদী। সহেলিদেবী পেশায় প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা। পৈতৃক বাড়ি পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটের চানক গ্রামে। ছোট থেকে ছবি আঁকা, শিল্পকলার প্রতি তাঁর ঝোঁক। সেজন্য একসময় পৈতৃক গ্রামেও এভাবে মানুষ ঝুলন শুরু করেছিলেন। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি বনকাটিতে এসে একইরকমভাবে মানুষ ঝুলন শুরু করেন। গত ২৬ আগষ্ট থেকে এই বছরও ৩০ জন ছেলেমেয়ে এই ঝুলন উৎসব নিজেদের বিভিন্ন রূপে সজ্জিত করে দর্শনার্থীদের বিনোদন দিচ্ছেন। মণ্ডপের মধ্যে ছোট স্টল করা হয়েছে। তাতে কোনও স্টলে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ভক্ত রামায়নে প্রভু শ্রীরামের নিলপদ্ম দিয়ে দূর্গাপুজোর প্রেক্ষাপট। আবার কোনটায় সুর্পনখা বধ। আবার কোনটাই বাবা লোকনাথের নানান কাহিনী। আবার কোনটাই জগন্নাথদেব ও মা লক্ষীর মানভঞ্জন। পঞ্চবটি অরণ্যে সীতার সন্নিধ্যে হুনুমানের পরিচয়। সহেলিদেবী বলেন, 'গ্রামবাসীদের আনন্দ, উৎসাহ, বিনোদন দিতেই মানুষ ঝুলন উৎসব পালন। এছাড়াও বর্তমান সমাজে শিশুমন মোবাইলে আসক্ত। রামায়ণ-মহাভারত সহ পৌরাণিক কাহিনি অনেকে জানে না। তাই মোবাইলের আসক্তি কমাতে এভাবে ঝুলন উৎসবের মাধ্যমে শিশুমনে সেসব রামায়ণ মহাভারতের ইতিহাসের বিষয় তুলে ধরে পাঠ দেওয়া। বিগত পাঁচ বছর ধরে বনকাটি ছাড়াও আশপাশের প্রচুর মানুষ এই মিলন উৎসবে শামিল হন। খুব আনন্দ উপভোগ করেন।'
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, 'ঝুলন যাত্রা হল রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, ভক্তি এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যের এক মিলনক্ষেত্র। যা প্রতি বছর ভক্তদের আনন্দ ও অনুপ্রেরণা জোগায়। গ্রামের গৃহবধূর হাত ধরে ঝুলন উৎসবের সূচনা। প্রচুর মানুষের সমাগম হয়।'
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা