ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব আস্থা, প্রযুক্তি ও বহু দশকের কৌশলগত সহযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত: কর্নেল শ্রীবাস্তব
কলকাতা, ৩১ আগস্ট (হি. স.): ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব কেবল সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহু দশকের পারস্পরিক বিশ্বাস, প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ, শিল্প ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং দেশীয় সক্ষম
কর্নেল শ্রীবাস্তব


কলকাতা, ৩১ আগস্ট (হি. স.): ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব কেবল সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহু দশকের পারস্পরিক বিশ্বাস, প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ, শিল্প ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কলকাতায় আয়োজিত ‘সম্পর্ক — ভারত-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সম্মেলন’-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই কথা বলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল তথা মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের প্রাক্তন ডিরেক্টর এবং ওয়েলিংটনের ডিফেন্স সার্ভিসেস স্টাফ কলেজের প্রাক্তনী আর. কে. শ্রীবাস্তব।

সম্মেলনে ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনাকালে কর্নেল শ্রীবাস্তব জানান, গত কয়েক দশক ধরে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা ভারতের সামরিক, প্রযুক্তিগত ও শিল্পভিত্তিক সক্ষমতাকে এক নতুন রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি বলেন, ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে কেবল সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ঠিক হবে না। এই অংশীদারিত্ব ভারতকে প্রযুক্তি অর্জন করা, তা গভীরভাবে বোঝা এবং তার ভিত্তিতে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলার অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে।

কর্নেল শ্রীবাস্তব উল্লেখ করেন, “আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখা উচিত। রাশিয়া থেকে প্রাপ্ত সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি কীভাবে আমাদের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করেছে, তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। পেছনে তাকালে আমরা অনুভব করতে পারি যে রাশিয়া থেকে আমরা কতটা সহায়তা পেয়েছি এবং এই সহযোগিতা আমাদের প্রতিরক্ষাক্ষেত্রকে কতটা সমৃদ্ধ করেছে।”

তিনি জানান, রুশ সামরিক সরঞ্জামগুলি ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিকাশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের অংশ ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্ক ঐতিহ্যগত ক্রেতা-বিক্রেতার পরিধি অতিক্রম করে প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ, যৌথ উৎপাদন এবং দেশীয় শিল্প সক্ষমতা অর্জনের দিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “রুশ সরঞ্জামের কথা বললে বলতে হয়, তাদের বিভিন্ন ব্যবস্থা কোনো না কোনোভাবে আমাদের কাছে উপলব্ধ ছিল। আমরা সেগুলি ব্যবহার করেছি, পরিচালনা করেছি এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ভিত্তিতে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলেছি।”

কর্নেল শ্রীবাস্তব সেই সময়ের কথা উল্লেখ করেন যখন রাশিয়া ভারতকে কেবল সামরিক সরঞ্জামই নয়, বরং মেশিনারিও সরবরাহ করেছিল, যা দেশে উৎপাদন পরিকাঠামো স্থাপন ও শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছিল। এই সহযোগিতা কেবল তৎকালীন সামরিক প্রয়োজন মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ভারতে এমন এক শিল্প পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল, যা ওই ব্যবস্থাগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ও ভবিষ্যতের উন্নয়নে সক্ষম।

ভারত-রাশিয়া কৌশলগত সম্পর্কের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি ১৯৭১ সালের সময়কালকে দুই দেশের বন্ধুত্ব ও কৌশলগত সহযোগিতার এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি জানান, রুশ সামরিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের ফলে ভারতে প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞতা, প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার এক শক্ত ভিত তৈরি হয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা ভাণ্ডারের এক বিশাল অংশ রাশিয়া থেকে প্রাপ্ত সরঞ্জাম বা দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত।

তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, ভারত এখন আর কেবল বিদেশি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল দেশ নয়। ভারতীয় সেনা ও প্রতিষ্ঠানগুলি সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিকীকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। একই সঙ্গে দেশে প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ক্ষমতাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

রাশিয়ার প্রধান যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অংশীদারিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রযুক্তি হস্তান্তর। সুখোইসহ বহু প্রধান বিমান রাশিয়ার সহযোগিতায় ভারতে এসেছে। তবে আসল শক্তি নিহিত রয়েছে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মধ্যে।

তিনি জানান, বর্তমানে ভারতের প্রয়োজন বদলাচ্ছে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মূল জোর কেবল কেনাকাটায় নয়, বরং যৌথ গবেষণা, উন্নয়ন, উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় হওয়া উচিত। এতে ভারতের আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্প আরও সুদৃঢ় হবে। যৌথভাবে প্রযুক্তি বিকাশ ও পণ্য তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়াই এখন মূল লক্ষ্য।

কর্নেল শ্রীবাস্তব বলেন, কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা উভয় দেশকে উদীয়মান ক্ষেত্রগুলিতে সহযোগিতার পরিধি বাড়াতে মজবুত ভিত্তি প্রদান করে। ভবিষ্যতে ভারত ও রাশিয়ার প্রযুক্তিগত ও শিল্প পরিকাঠামোকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বক্তব্যের শেষে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বজায় থাকা পারস্পরিক বিশ্বাস ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা। এই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আগামী দিনে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, শিল্প এবং গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতাকে আরও প্রসারিত করা উচিত।

হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি




 

 rajesh pande