
কলকাতা, ১৫ জানুয়ারি, (হি স)। “গঙ্গা নদীর দূষণ বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। এক সময়ে শিশুরা এই নদীতে সাঁতার কাটত, কিন্তু এখন অভিভাবকরা সন্তানদের নদীর ধারে যেতেও নিষেধ করেন।” বৃহস্পতিবার বিজেপি-র সল্টলেক দফতরে সংবাদমাধ্যমের কাছে এই অভিযোগ করেন বিধায়ক ডঃ অশোক লাহিড়ী।
প্রধান মুখপাত্র অ্যাডভোকেট দেবজিত সরকারের উপস্থিতিতে অশোকবাবু বলেন,
১৮ ডিসেম্বর ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ২৪ জুলাই সাংসদ জগন্নাথ সরকার গঙ্গা নদী সম্পর্কে একটি প্রশ্ন করেন। গঙ্গা নদী বা ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি পশ্চিমবঙ্গের মেরুদণ্ডস্বরূপ; এই নদীর জল গৃহস্থালির কাজ, সেচ এবং পরিবহণে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই নদী ভগবান শিবের জটারাজি থেকে প্রবাহিত, তাই এর ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম।
অশোকবাবু বলেন, অতীতে নদীর কাছাকাছি শহর গড়ে তোলা হত যাতে সেই জল গৃহস্থালির কাজ, সেচ এবং নিয়ন্ত্রিত নিকাশির জন্য ব্যবহার করা যায়। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহারে নদীর জল মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের ঘাটতি থাকলেও বহু কারখানার বর্জ্য জল সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে।
ডঃ লাহিড়ী জানান, গঙ্গা নদীর প্রবাহপথ অনুসরণ করে কেন্দ্র সরকার উত্তরাখণ্ড, উত্তর প্রদেশ, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের জন্য ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্প চালু করে। পশ্চিমবঙ্গের জন্য মোট ৩১টি প্রকল্পে ৪৬০৫.৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৬টি প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক প্রকল্প এখনও অসম্পূর্ণ।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর তৃণমূল সরকার কেন কোনও বক্তব্য দিচ্ছে না? গ্রিন ট্রাইব্যুনালের সামনে পেশ করা নমামি গঙ্গে প্রকল্পের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১০টি প্রকল্পের অধীনে ১৪টি বাঁধ ও ৯টি শ্মশান অনুমোদিত হয়, যার মোট ব্যয় ছিল ৪৯.৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৩টি বাঁধ ও ৩টি শ্মশান সম্পূর্ণ হয়েছে এবং জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত। এতে প্রমাণিত হয় যে কেন্দ্র সরকার এই প্রকল্পে সম্পূর্ণ সহায়তা করেছে।
ডঃ লাহিড়ী বলেন, গঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই রাজ্য সরকার দোষ চাপায় অন্য রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের উপর; অথচ এই বিষয়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনও বিবৃতি বা নথি প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৪ সালে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল পশ্চিমবঙ্গকে সতর্ক করে এবং ২০১৯ সালে অনিয়ন্ত্রিত দূষণের জন্য পশ্চিমবঙ্গকে ২৫ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়। নিকাশি জল নদীতে ফেলা যেতে পারে, কিন্তু তার বিষাক্ততার মাত্রা জানা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, নদীতে ফেলা বর্জ্য পচনের পর জলে জৈব অক্সিজেনের চাহিদা (বিওডি) বৃদ্ধি পায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কলকাতা থেকে ৬৩.৬১ কোটি লিটার, হাওড়া থেকে ৯১ কোটি লিটার, ব্যারাকপুর থেকে ২১ কোটি লিটার এবং কোন্নগর ও রিষড়া থেকে ১২ কোটি লিটার নিকাশি জল নদীতে ফেলা হয়। এর ফলে জৈব অক্সিজেনের চাহিদা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।
নিকাশি শোধনাগারে বর্জ্য জল পরিশোধন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে ৩৩টি নিকাশি শোধনাগার পাওয়ার কথা থাকলেও সম্পূর্ণ আর্থিক সহায়তা পাওয়া সত্ত্বেও মাত্র ১৬টি তৈরি হয়েছে। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গা নদীর তীরবর্তী ৩০টি শহরের মধ্যে মোট ৪০টি নিকাশি শোধনাগারের ১১টি সম্পূর্ণ অচল এবং ২৪টি ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের মানদণ্ড অনুযায়ী কার্যত অচল।
পশ্চিমবঙ্গে প্রতিদিন ২৫৯ মিলিয়ন লিটার নিকাশি জল গঙ্গা নদীতে ফেলা হয়, যার ফলে নদীর জল স্নানের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। এখন সরকারের করণীয় কী? তিনি রাজ্য সরকারকে প্রশ্ন করেন, ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্পে কেন্দ্র সরকার কোথায় আর্থিক সহায়তা দেয়নি, তা স্পষ্ট করে জানাক।
তিনি বলেন, এতদিন রাজ্যে কোনও নতুন প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়নি, অথচ নির্বাচনের মুখে এসে হঠাৎ করে একের পর এক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছে। এখন গঙ্গাসাগরে একটি সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই প্রকল্পের কোনও বিস্তারিত তথ্য বা নির্মাণ ব্যয়ের পরিমাণ এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / মৌসুমী সেনগুপ্ত