
আগরতলা, ১১ অক্টোবর (হি.স.) : রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। গুরুতরভাবে হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় আগরতলার আইজিএম হাসপাতালে চালু হলো এমিসিজুমাব থেরাপি। এই উদ্যোগের ফলে হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা পরিষেবা আরও উন্নত ও সহজলভ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে, এমন রোগীদের জন্য এই পরিষেবা নতুন আশার আলো দেখাবে। রবিবার আগরতলা গভর্নমেন্ট ডেন্টাল কলেজের কনফারেন্স হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই পরিষেবার সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্য সচিব কিরণ গিত্যে, স্বাস্থ্য দফতরের অধিকর্তা ডাঃ দেবশ্রী দেববর্মা, হিমোফিলিয়া স্টেট লেভেল টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারপার্সন ডাঃ সঞ্জীব দেববর্মা, আইজিএম হাসপাতালের মেডিকেল সুপার ডাঃ বিমল সরকার-সহ স্বাস্থ্য দফতরের অন্যান্য আধিকারিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে আজকের দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরিষেবা আগে পর্যাপ্ত পরিমাণে সহজলভ্য ছিল না। চিকিৎসার প্রয়োজনে সুদূর মুম্বাই থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে এনে সংরক্ষণ করতে হতো। ফলে এই ধরনের রোগীদের চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাজ্যে হিমোফিলিয়া চিকিৎসা পরিষেবার পরিকাঠামো ধীরে ধীরে গড়ে ওঠার পর থেকেই এই সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়। অবশেষে আইজিএম হাসপাতালে এমিসিজুমাব থেরাপি চালুর মাধ্যমে সেই উদ্যোগ বাস্তব রূপ পেল।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, মানবদেহে বিভিন্ন ধরনের রোগ ও শারীরিক সমস্যা দেখা দিতেই পারে। সবকিছু সব সময় স্বাভাবিক থাকবে, এমনটা আশা করা যায় না। কিন্তু রোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে মানুষের কাছে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। রাজ্য সরকার এবং স্বাস্থ্য দফতর স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নে যে কোনও ধরনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে প্রস্তুত। মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নে সরকার কোনও রকম আপস করতে চায় না বলেও তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়।
এই প্রকল্পের আর্থিক দিকটি তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য রাজ্য সরকার বছরে প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা ব্যয় করছে। এই পরিষেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রোগীদের প্রদান করা হচ্ছে। আর্থিক কারণে যাতে কোনও রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সেই লক্ষ্যেই সরকারের এই উদ্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে।
হিমোফিলিয়া একটি বংশগত রক্তক্ষরণজনিত রোগ। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দেয়। ফলে সামান্য আঘাতেও দীর্ঘ সময় ধরে রক্তক্ষরণ হতে পারে এবং গুরুতর ক্ষেত্রে শরীরের অভ্যন্তরেও রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকে। সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে রোগীর জীবনযাত্রায় এর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। এমিসিজুমাব একটি প্রতিরোধমূলক ওষুধ, যা নির্দিষ্ট ধরনের হিমোফিলিয়ায় রক্তক্ষরণের ঘটনা কমাতে সাহায্য করে। তাই রাজ্যে এই থেরাপি চালুর ফলে সংশ্লিষ্ট রোগীদের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলো।
স্বাস্থ্য পরিষেবার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও এদিন একটি উল্লেখযোগ্য কর্মসূচিতে অংশ নেন মুখ্যমন্ত্রী। আইজিএম হাসপাতাল কমপ্লেক্সের নার্সিং কলেজের অডিটোরিয়ামে ত্রিপুরা সিভিল সার্ভিস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে শারদ উৎসব উপলক্ষ্যে বস্ত্রদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে আইজিএম হাসপাতাল, আগরতলা গভর্নমেন্ট ডেন্টাল কলেজ এবং আগরতলা গভর্নমেন্ট নার্সিং কলেজের সাফাইকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দেওয়া হয়।
উৎসবের আনন্দ সমাজের সকল স্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের সম্মান জানানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ত্রিপুরা সিভিল সার্ভিস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের এই সামাজিক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি সংগঠনের সদস্যদের এ ধরনের মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড আগামী দিনেও অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
একদিকে গুরুতর হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসা পরিষেবার সূচনা, অন্যদিকে হাসপাতালের সাফাইকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ—দুটি কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এদিন স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তাও উঠে আসে। রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে উন্নত ও মানবিক চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ