
শান্তিরবাজার (ত্রিপুরা), ১২ অক্টোবর (হি.স.) : বর্তমান ডিজিটাল যুগে মোবাইল, কম্পিউটার ও প্রযুক্তির প্রতি কিশোর-কিশোরীদের আকর্ষণ ক্রমশ বাড়ছে। এর মধ্যেও মাটির প্রতি ভালোবাসা এবং সৃজনশীলতার অনন্য নজির স্থাপন করেছে বাইখোড়ার জগন্নাথ পাড়ার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র শুভ্রজিৎ দাস। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের হাতে মাটি দিয়ে দেবী সরস্বতীর প্রতিমা তৈরির পর এবার দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে সকলের নজর কেড়েছে সে। তাঁর এই সৃজনশীল উদ্যোগকে ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে উৎসাহ ও কৌতূহল।
বাইখোড়ার জগন্নাথ পাড়ার বাসিন্দা শিবশঙ্কর দাসের ছেলে শুভ্রজিৎ কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। এই অল্প বয়সেই মাটির কাজের প্রতি তার গভীর আগ্রহ সকলকে অবাক করেছে। সাধারণত এই বয়সে পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা ডিজিটাল দুনিয়ায় সময় কাটাতেই বেশি আগ্রহ দেখা যায়। কিন্তু শুভ্রজিৎ-এর আগ্রহ একটু অন্যরকম। মাটি দিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী ও প্রতিমা তৈরি করতেই সে বেশি আনন্দ পায়। নিজের সেই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে প্রথমে দেবী সরস্বতীর প্রতিমা তৈরি করে সে। এরপর পরিবারের সদস্য, আর্টের শিক্ষক এবং স্থানীয় মৃৎশিল্পীর সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় এবার নিজের হাতে গড়ে তুলেছে দেবী দুর্গার প্রতিমা।
শুভ্রজিৎ-এর এই উদ্যোগ কেবল প্রতিমা তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের সৃজনশীল প্রতিভাকে কীভাবে বিকশিত করা যায়, তারও একটি সুন্দর উদাহরণ। মাটির তাল থেকে ধীরে ধীরে দেবীর প্রতিমার রূপ ফুটিয়ে তোলা যে কতটা ধৈর্য, নিষ্ঠা ও মনোযোগের কাজ, সেটি তাঁর এই প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার তৈরি দুর্গাপ্রতিমা দেখতে প্রতিদিনই জগন্নাথ পাড়ায় ভিড় জমাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শুভ্রজিৎ জানায়, প্রতিমা তৈরি করা তার কাছে শুধুমাত্র একটি কাজ নয়, বরং এক ধরনের নেশা। পড়াশোনার পাশাপাশি সে এই কাজ করে আনন্দ পায়। ভবিষ্যতে পড়াশোনা করে সে যত বড় অফিসার, চিকিৎসক কিংবা ইঞ্জিনিয়ারই হোক না কেন, প্রতিমা তৈরির কাজ কখনও ছাড়বে না বলে জানিয়েছে সে। তাঁর কথায়, পেশাগত জীবনে যে পথই বেছে নিক, মাটির সঙ্গে তাঁর এই সম্পর্ক অটুট থাকবে।
তবে শুভ্রজিৎ-এর এই যাত্রাপথে সব অভিজ্ঞতা একরকম নয়। প্রতিমা তৈরিতে সময় দেওয়ার কারণে তাঁর পড়াশোনার ক্ষতি হতে পারে বলে কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আবার অনেকে তাঁর প্রতিভা ও আগ্রহকে সাধুবাদ জানিয়ে উৎসাহ জুগিয়েছেন। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যরা, তাঁর আর্টের শিক্ষক এবং স্থানীয় এক মৃৎশিল্পী তাঁকে প্রতিমা তৈরির কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। স্থানীয় ওই মৃৎশিল্পী জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে মাটি ও প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে তিনি শুভ্রজিৎকে সাহায্য করবেন।
শুভ্রজিৎ আরও জানিয়েছে, তাঁর নিজের হাতে তৈরি দুর্গাপ্রতিমাকে সামনে রেখেই জগন্নাথ পাড়ায় দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হবে। ফলে তাঁর এই সৃজনশীল প্রচেষ্টা এবার পুজোর আনন্দের সঙ্গে এক বিশেষ আবেগের বন্ধন তৈরি করতে চলেছে। নিজের হাতে তৈরি প্রতিমার মাধ্যমে পুজোয় অংশ নেওয়ার সুযোগ তাঁর কাছে নিঃসন্দেহে এক বড় প্রাপ্তি।
অল্প বয়সে শুভ্রজিৎ-এর এই উদ্যোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তাঁর প্রতিভা দেখে অনেকেই তাঁকে আগামী দিনে আরও ভালো কাজ করার জন্য উৎসাহিত করছেন। উপযুক্ত সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ পেলে ভবিষ্যতে এই কিশোর প্রতিমা শিল্পের জগতে আরও এগিয়ে যেতে পারবে বলে আশাবাদী অনেকে।
ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়েও মাটির শিল্পের প্রতি শুভ্রজিৎ-এর এই ভালোবাসা প্রমাণ করে, প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও সৃজনশীলতার গুরুত্বও অপরিসীম। পড়াশোনার সঙ্গে নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে এগিয়ে চলার যে স্বপ্ন সে দেখছে, তা অন্য কিশোর-কিশোরীদের কাছেও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ