২০৪৭-এ বিকশিত ভারতের লক্ষ্য ও চিন্ময় মিশনের শতবর্ষের যাত্রা একই পথে এগোবে: প্রধানমন্ত্রী মোদী
নয়াদিল্লি, ২৩ অক্টোবর (হি.স.): ২০৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তির পাশাপাশি চিন্ময় মিশনও প্রতিষ্ঠার শতবর্ষের দিকে এগিয়ে যাবে। বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্য এবং চিন্ময় মিশনের শতবর্ষের যাত্রা একই সঙ্গে এগিয়ে চলবে, কারণ দু’টির উদ্দেশ্যের মধ্যে
২০৪৭-এ বিকশিত ভারতের লক্ষ্য ও চিন্ময় মিশনের শতবর্ষের যাত্রা একই পথে এগোবে: প্রধানমন্ত্রী মোদী


নয়াদিল্লি, ২৩ অক্টোবর (হি.স.): ২০৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তির পাশাপাশি চিন্ময় মিশনও প্রতিষ্ঠার শতবর্ষের দিকে এগিয়ে যাবে। বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্য এবং চিন্ময় মিশনের শতবর্ষের যাত্রা একই সঙ্গে এগিয়ে চলবে, কারণ দু’টির উদ্দেশ্যের মধ্যে মিল রয়েছে। শুক্রবার দিল্লির ভারত মণ্ডপমে চিন্ময় অমৃত মহোৎসব গ্লোবাল সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজকে বিভক্ত করার শক্তির বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা, আত্মনির্ভরতার বিষয়ে দেশবাসীকে সচেতন করা এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ার সংকল্পের সঙ্গে দেশের প্রতিটি মানুষকে যুক্ত করা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্য পূরণে সকলকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে বলেও আহ্বান জানান তিনি।

চিন্ময় মিশনের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোদী বলেন, এই মিশন কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি ভাবনা ও দর্শন। স্বামী চিন্ময়ানন্দ এই মিশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কয়েক দশকের যাত্রায় আধ্যাত্মিকতা ও সাংস্কৃতিক আদর্শকে কেন্দ্র করে মিশন নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মিশনের সঙ্গে যুক্ত সাধু-সন্ত, আচার্য, সাধক ও অনুগামীদের অমৃত মহোৎসবের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। বিকশিত ভারত নির্মাণে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বামী চিন্ময়ানন্দের হলোগ্রাম দেখে তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন মোদী। তিনি বলেন, সেই অভিজ্ঞতায় তাঁর মনে হয়েছিল যেন ৩৩ বছর পিছিয়ে গিয়েছেন। ১৯৯৩ সালে বরোদায় গুরুদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ, কথোপকথন, স্নেহ ও আশীর্বাদের স্মৃতি আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। এক মুহূর্তের জন্য তাঁর মনে হয়েছিল, যেন গুরুদেবের সরাসরি সান্নিধ্যে রয়েছেন। এই অভিজ্ঞতার জন্য চিন্ময় মিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী জানান, ১৯৯৩ সালে তিনি স্বামী চিন্ময়ানন্দকে আমেরিকার শিকাগোতে বিশ্ব ধর্ম সংসদের শতবর্ষ উদ্যাপনে আমন্ত্রণ জানাতে গিয়েছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক ভাষণের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ওই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল। স্বামী চিন্ময়ানন্দ আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে ওই উদ্যাপন সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন ও তাতে অংশ নিতে উৎসাহিত করেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, ধর্ম সংসদের অনুষ্ঠান শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে, ৩ আগস্ট আমেরিকার সান দিয়েগোতে স্বামী চিন্ময়ানন্দের মৃত্যু হয়। ১১ সেপ্টেম্বর শিকাগোতে ধর্ম সংসদের অনুষ্ঠানে গুরুদেবের অনুপস্থিতি তিনি গভীর ভাবে অনুভব করেছিলেন। তাঁর কথায়, গুরুদেবের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতে যুবশক্তির বিকাশ এবং সেই শক্তির মাধ্যমে শক্তিশালী ও সক্ষম ভারত গড়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, স্বামী চিন্ময়ানন্দের সঙ্গে সাক্ষাতের কয়েক বছর পর তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে জনসেবার সুযোগ পান। তার পর থেকে গত ২৫ বছর ধরে সরকারপ্রধান হিসেবে দেশসেবার যাত্রায় গুরুদেবের আশীর্বাদ তাঁর সঙ্গে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর প্রচেষ্টা ও নীতির কেন্দ্রে দেশের যুবসমাজ থেকেছে বলেও দাবি করেন মোদী।

চিন্ময় অমৃত মহোৎসবে যুবকদের অংশগ্রহণের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী জানান, মিশনের তরুণ সদস্যরা প্রায় ৩০০ দিনে ৪০ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন এবং এক লক্ষেরও বেশি যুবকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এই উদ্যোগের জন্য মিশনের পুরো দলকে অভিনন্দন জানান তিনি।

আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রসঙ্গে উপনিষদের ‘বয়ম্ অমৃতস্য পুত্রাঃ’ মন্ত্রের উল্লেখ করেন মোদী। এর অর্থ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, মানুষ অমৃতের সন্তান। এটি শুধু আধ্যাত্মিক দর্শন নয়, ভারতের সাংস্কৃতিক বিশ্বাসেরও পরিচায়ক। এখানে শরীরের অমরত্ব নয়, বরং চেতনা, জ্ঞান ও বোধের চিরন্তনতার কথা বলা হয়েছে। এই উপলব্ধিই ভারতকে হাজার হাজার বছর ধরে তার সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখতে সাহায্য করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বেদের ‘বয়ং রাষ্ট্রে জাগৃয়াম পুরোহিতাঃ’ মন্ত্রের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাঁরা দেশের কল্যাণ চান, তাঁদের রাষ্ট্রকে জাগ্রত ও উন্নত করার জন্য কাজ করতে হবে। স্বামী চিন্ময়ানন্দ নিজের জীবন এই আদর্শ অনুসারেই পরিচালিত করেছিলেন। আধ্যাত্মিক বিষয়ের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন বিষয়েও তিনি সরব ছিলেন বলে জানান মোদী।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বামী চিন্ময়ানন্দের বার্তা ছিল আধ্যাত্মিক উন্নতির সঙ্গে ব্যক্তিগত উন্নতি এবং ব্যক্তিগত উন্নতির সঙ্গে রাষ্ট্রের অগ্রগতিকে যুক্ত করা। মানুষের মধ্যে দেশের প্রতি আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তোলা তাঁর মিশনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। সেই লক্ষ্যেই তিনি গীতা জ্ঞান যজ্ঞের সূচনা করেন এবং উপনিষদ, বেদান্ত ও ভারতীয় শাস্ত্রের জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন।

চিন্ময় মিশনের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, মিশনের উদ্যোগে আজ বহু তরুণ ভারতীয় মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন এবং সাংস্কৃতিক দূতের ভূমিকা পালন করছেন। মিশনের শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লক্ষ লক্ষ শিশু ও যুবকের ভবিষ্যৎ গঠনে অবদান রাখছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কার ও মূল্যবোধের শিক্ষাও দেওয়া হয়।

মোদী বলেন, স্বামী চিন্ময়ানন্দের মতো দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ভারতীয় মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত করার যে ভাবনা রেখেছিলেন, নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি সেই দিশাতেই এগিয়েছে। এই নীতিতে ভারতীয় জ্ঞান-পরম্পরা, মাতৃভাষায় শিক্ষা, আধুনিক বিজ্ঞান ও নতুন প্রযুক্তির উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কন্যাকুমারীর বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল নির্মাণে স্বামী চিন্ময়ানন্দের অবদানের কথাও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, একনাথ রানাডের এই উদ্যোগে স্বামী চিন্ময়ানন্দ দৃঢ় ভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং এই স্মারক নির্মাণের জন্য প্রথম আর্থিক অবদানও তিনিই দিয়েছিলেন। বর্তমানে স্মারকটি দেশ-বিদেশ থেকে আসা বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন মোদী।

দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্রের পুনরুজ্জীবনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী কাশী বিশ্বনাথ ধামের নতুন রূপ, অযোধ্যায় রামমন্দির, উজ্জয়িনীর মহাকাল মহালোক এবং কেদারনাথ ও বদ্রীনাথের মতো তীর্থস্থলের উন্নয়নের কথা বলেন। কেদারনাথে আদি শঙ্করাচার্যের মূর্তি স্থাপনের বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।

মোদীর বক্তব্য, এক সময় ভারত থেকে বহু প্রাচীন মূর্তি চুরি করে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখানে বিক্রি করা হয়েছিল। গত ১২ বছরে সেই সব চুরি যাওয়া প্রাচীন মূর্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। দেশের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্থান পাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। স্বামী চিন্ময়ানন্দ যেমন ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনকে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তেমনই আন্তর্জাতিক যোগ দিবসও বিশ্বজুড়ে মানুষকে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মুক্তির আত্মবিশ্বাস প্রমাণ করে যে ভারত তার ঋষি ও দেশপ্রেমিকদের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলেছে। এই যাত্রায় দেশের চিন্তাশক্তিই সবচেয়ে বড় সম্পদ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে মোদী বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্দেশ্য থাকতে পারে, কিন্তু দেশের উন্নয়ন ও গৌরব সকলকে এক সূত্রে বাঁধতে পারে। স্বামী চিন্ময়ানন্দ তাঁর সময়ের চ্যালেঞ্জ অনুযায়ী কাজের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক সমস্যাও সামনে এসেছে। সেগুলির সমাধানের দায়িত্ব সকলের বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

সমাজকে বিভক্ত করার শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, আত্মনির্ভরতার বিষয়ে দেশবাসীকে সচেতন করা এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ার সংকল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। চিন্ময় মিশনের কাছে গুরুদেবের উত্তরাধিকার, কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বজুড়ে নিবেদিতপ্রাণ আচার্য, সাধক ও কর্মীদের বৃহৎ পরিবার রয়েছে উল্লেখ করে মোদী বলেন, বিকশিত ভারত নির্মাণে মিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে তিনি আশাবাদী। শেষে স্বামী চিন্ময়ানন্দকে শ্রদ্ধা জানিয়ে মিশনের সঙ্গে যুক্ত সকলকে অমৃত মহোৎসবের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী।

---------------

হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য




 

 rajesh pande