
আগরতলা, ২৬ অক্টোবর (হি.স.) : পুজো উপলক্ষ্যে বিনামূল্যে চিনি, ময়দা ও সুজি বিতরণকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্কে ফের বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরীকে নিশানা করলেন খাদ্যমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী। সরকারের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগকে ঘিরে বিরোধীরা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পাশাপাশি, বিরোধী দলনেতা দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি-র সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশকে দুর্বল করার চক্রান্তে সামিল হচ্ছেন বলেও দাবি করেন মন্ত্রী। কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিআই(এম)-এর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিরোধী দলগুলির কোনও নীতি-আদর্শ নেই।
সোমবার নিজ দফতরে সাংবাদিক সম্মেলন করে খাদ্যমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী ফের একবার পুজোর রেশনসামগ্রী বিতরণ নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। এর আগে তিনি খাদ্য দফতরের আধিকারিকদের নিয়ে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। বৈঠকে সমস্ত মহকুমার আধিকারিকদের সঙ্গে চিনি, ময়দা ও সুজি বিতরণ সংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি সিপিআই(এম) এবং বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরীর বিরুদ্ধে সরব হন।
খাদ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যেই বিরোধীরা এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করছে। তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষের স্বার্থে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিয়ে অযথা বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বিরোধী দলনেতার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। মন্ত্রীর দাবি, দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি-এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিরোধী দলনেতা দেশকে দুর্বল করার চক্রান্তে সামিল হচ্ছেন। একই সঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিআইএম-এর রাজনৈতিক সমঝোতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, যে দলের সঙ্গে একসময় সিপিআই(এম)-র সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিল, আজ সেই দলের সঙ্গেই তারা গলা মেলাচ্ছে। তাঁর মতে, বিরোধী দলগুলির কোনও নির্দিষ্ট নীতি বা আদর্শ নেই।
তবে খাদ্যমন্ত্রীর এই রাজনৈতিক আক্রমণের মধ্যেই পুজোর রেশনসামগ্রী বিতরণ নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের প্রশ্নটিও সামনে আসছে। শারদ উৎসব শুরুর কিছুদিন আগে খাদ্যমন্ত্রী নিজেই সাংবাদিক সম্মেলন করে রাজ্যের প্রতিটি রেশন কার্ডপিছু বিনামূল্যে এক লিটার সর্ষের তেল, এক কেজি চিনি, দুই কেজি ময়দা এবং ৫০০ গ্রাম সুজি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। পুজোর মরশুমে সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ কিছুটা কমাতেই এই উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
কিন্তু ঘোষণার পর সেই তালিকা থেকে সর্ষের তেল বাদ পড়ে যায়। অন্যদিকে, বাকি সামগ্রীগুলিও দুর্গাপুজো ও লক্ষ্মীপুজোর সময় বহু মানুষের হাতে পৌঁছয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সরকারের ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির ফারাক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে লক্ষ্মীপুজোকে ঘিরে এই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। রাজ্যের বহু পরিবারে ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপুজো পালিত হয়। এই উৎসবের সময় চিনি, ময়দা ও সুজির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। কিন্তু সরকারি ঘোষণার সামগ্রী সময়মতো না পাওয়ায় অনেক পরিবারকে খোলা বাজার থেকে চড়া দামে চিনি-সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হয়েছে বলে অভিযোগ। এতে সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, পুজোর আগে সরকারি স্তরে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা যথাসময়ে বাস্তবায়িত না হওয়ায় মানুষ প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে, খাদ্যমন্ত্রী এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারের অভিযোগ তুলছেন। ফলে জনস্বার্থে ঘোষিত একটি প্রকল্পকে ঘিরে প্রশাসনিক বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক চাপানউতোর—দুই বিষয়ই সামনে এসেছে।
এদিকে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমনে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কিংবা বাকি রেশনসামগ্রী কবে নাগাদ সমস্ত পভোক্তার কাছে পৌঁছবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট আশ্বাসের অপেক্ষায় রয়েছেন বহু মানুষ। রাজনৈতিক তরজা চললেও মূল প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—পুজোর আগে ঘোষিত বিনামূল্যের সামগ্রী সময়মতো মানুষের হাতে পৌঁছল না কেন?
সরকারের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের প্রচার এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণের পাশাপাশি এই প্রশ্নের জবাব দেওয়াও এখন খাদ্য দফতরের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে ঘোষিত সুবিধা সময়মতো পৌঁছনোই যে কোনও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ