ত্রিপুরায় ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে ভোটগণনায় তিপ্রা মথার দাপট, ৩,০৩০ আসনে জয়
আগরতলা, ৫ অক্টোবর (হি.স.) : দীর্ঘ ১০ বছরের ব্যবধানের পর অনুষ্ঠিত ত্রিপুরা আদিবাসী এলাকা স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ (টিটিএএডিসি) ভিলেজ কমিটি নির্বাচনের ভোটগণনা ঘিরে সোমবার রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে ওঠে। একদিকে ফলাফলে তিপ্রা মথার দাপট অব্যাহত
তিপ্রা মথার বিজয়োল্লাস


আগরতলা, ৫ অক্টোবর (হি.স.) : দীর্ঘ ১০ বছরের ব্যবধানের পর অনুষ্ঠিত ত্রিপুরা আদিবাসী এলাকা স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ (টিটিএএডিসি) ভিলেজ কমিটি নির্বাচনের ভোটগণনা ঘিরে সোমবার রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে ওঠে। একদিকে ফলাফলে তিপ্রা মথার দাপট অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন গণনাকেন্দ্রের বাইরে সংঘর্ষ, রাস্তা অবরোধ, হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সর্বশেষ প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩,৮৪৫টি আসনের ফল ঘোষণা হয়েছে। এর মধ্যে তিপ্রা মথা ৩,০৩০টি আসনে জয়ী হয়েছে। বিজেপি পেয়েছে ৬০৩টি আসন। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১২৪টি, সিপিআই(এম) ৫৩টি, আইপিএফটি ২০টি এবং কংগ্রেস ১০টি আসনে জয় পেয়েছে। তিনটি আসন এখনও শূন্য রয়েছে বলে জানা গেছে।

সোমবার সকাল ৮টা থেকে রাজ্যের ৪৫টি কেন্দ্রে ভিলেজ কমিটির ভোটগণনা শুরু হয়। গণনার জন্য মোট ৪৪টি গণনাহল প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। গোটা প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য প্রায় ২,০০০ কর্মী মোতায়েন করা হয়। রাজ্য নির্বাচন কমিশনের এক পদস্থ আধিকারিক জানান, যেসব কেন্দ্রে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক ভিলেজ কমিটির ভোট গণনা হচ্ছে, সেখানে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত গণনা গড়াতে পারে।

ভোটগণনার শুরুতে একাধিক কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি থাকলেও দুপুর গড়াতেই সেপাহিজালা ও ধলাই জেলার বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও গণনাকেন্দ্রে এজেন্টদের প্রবেশ নিয়ে বিরোধ, কোথাও রাস্তা অবরোধ, আবার কোথাও নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে গণনাকেন্দ্রের দিকে যাওয়ার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সেপাহিজালা জেলার কাঁঠালিয়া ব্লকের পলিবাড়ি দ্বাদশ শ্রেণি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে পাঁচটি ভিলেজ কমিটির ভোটগণনাকে ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিপ্রা মথা সমর্থকরা গণনাকেন্দ্রের দিকে যাওয়ার রাস্তা অবরোধ করেন এবং অভিযোগ ওঠে, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের গণনাকেন্দ্রের চত্বরে পৌঁছাতে বাধা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা যাত্রাপুর থানার বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন সেপাহিজালা জেলার পুলিশ সুপার বিজয় দেববর্মা।

অন্যদিকে, ধলাই জেলার সালেমা ব্লকেও গণনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায়। সিপিআই(এম)-এর কর্মী-সমর্থকদের অভিযোগ, মহারানি হাই স্কুল গণনাকেন্দ্রে তাঁদের গণনা এজেন্টদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাঁদের এজেন্টদের পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে মহারানি এলাকায় রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান সিপিআই(এম) কর্মী-সমর্থকরা।

খোয়াই জেলাতেও ভোটগণনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তুলশিখর ব্লকের নির্ধারিত গণনাকেন্দ্র ভারত সর্দার বিদ্যালয়ের বাইরে নিরাপত্তা বাহিনীকে লাঠিচার্জ করতে হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, একটি দল নিরাপত্তা ব্যারিকেড সরিয়ে গণনাকেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যরা লাঠিচার্জ করেন। ঘটনায় মহিলা সহ প্রায় ১০-১২ জন আহত হন। আহতদের খোয়াই জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার মান্দাই ব্লকেও কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ভোটগণনা চলে। সেখানে ১৫টি ভিলেজ কমিটির মোট ৫৭টি আসনের ভোট গণনা করা হয়। গণনাকেন্দ্রগুলিতে রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

তবে সব জায়গায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল না। মুঙ্গিয়াকামি ব্লকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগণনা হয়। বিশেষভাবে নজর কেড়েছে বিজেপি ও তিপ্রা মথার সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলাফল। ছয়টি আসনে দুই দলের প্রার্থীরা মুখোমুখি লড়াই করেন। ফলাফলে তিপ্রা মথা চারটি আসনে জয় পায়, আর বিজেপি-সমর্থিত প্রার্থীরা দুটি আসনে জয়ী হন।

মুঙ্গিয়াকামির পরিস্থিতি সম্পর্কে টিটিএএডিসি-র এমডিসি তথা তিপ্রা মথা নেতা উৎপল দেববর্মা জানান, সেখানে ভোটগ্রহণ এবং ভোটগণনা উভয়ই শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলের পর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলে এলাকার উন্নয়নে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান তিনি।

জনজাতি কল্যাণ মন্ত্রী তথা বিজেপি বিধায়ক বিকাশ দেববর্মাও মুঙ্গিয়াকামির ভোটগণনাকে শান্তিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। বিজেপি ও তিপ্রা মথার প্রার্থীদের মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, তাকে তিনি ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ লড়াই’ হিসেবে অভিহিত করেন।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ এক দশকের ব্যবধানের পর গত ২৮ সেপ্টেম্বর ত্রিপুরার টিটিএএডিসি এলাকায় ভিলেজ কমিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে সার্বিক ভোটের হার ছিল ৮১.২১ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ৩ অক্টোবর তিনটি ভোটকেন্দ্রে পুনঃভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সোমবার সকাল থেকে রাজ্যের বিভিন্ন গণনাকেন্দ্রে শুরু হয় ভোটগণনা। ফলাফলে এখনও পর্যন্ত তিপ্রা মথার ব্যাপক সাফল্য পাহাড়ের রাজনীতিতে তাদের সাংগঠনিক শক্তিরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে গণনাকেন্দ্র ঘিরে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ও অভিযোগের ঘটনাগুলি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক মহলে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।

হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ




 

 rajesh pande