(রাউন্ড আপ) ডায়মন্ড হারবার ও মগরাহাট পশ্চিমে রেকর্ড পুনর্নির্বাচন, উত্তেজনা ও ধোঁয়াশার মাঝেও শান্তিতে মিটল ভোটগ্রহণ
দক্ষিণ ২৪ পরগনা, ২ মে (হি. স.): ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা মেটার মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার দুটি বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ১৫টি বুথে পুনর্নির্বাচন সম্পন্ন হলো। ১৪৩ নম্বর ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রের
ভোট দান


দক্ষিণ ২৪ পরগনা, ২ মে (হি. স.): ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা মেটার মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার দুটি বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ১৫টি বুথে পুনর্নির্বাচন সম্পন্ন হলো। ১৪৩ নম্বর ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রের ৪টি এবং ১৪২ নম্বর মগরাহাট পশ্চিম কেন্দ্রের ১১টি বুথে কড়া নিরাপত্তার বেষ্টনীতে সকাল ৭টা থেকে শুরু হয় ভোট । দিনভর বিক্ষিপ্ত উত্তেজনা, ভোটারদের বিভ্রান্তি এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে একগুচ্ছ অভিযোগের মাঝেই বিকেল ৫টা পর্যন্ত গড়ে ৮৬.৯০ শতাংশ ভোট পড়েছিল। তবে সন্ধ্যা ৬টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সময় সেই হার আরও বৃদ্ধি পায়। নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, পুনর্নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি শেষ পর্যন্ত ৯০ শতাংশের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে।

গত ২৯ এপ্রিল রাজ্যে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল। ওই দিন ভোট মিটতেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার চারটি বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ৭৭টি বুথে পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলেছিল বিরোধী দলগুলো। কমিশন সূত্রে খবর, ইভিএমে আঠা বা টেপ লাগিয়ে দেওয়া, সিসিটিভি ক্যামেরায় রুমাল চাপা দেওয়া এবং ভোটারের পকেটে ‘স্পাই ক্যামেরা’ রাখার মতো নজিরবিহীন সব অভিযোগ জমা পড়েছিল।

অভিযোগের গুরুত্ব বিচার করে বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত এলাকাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে রিপোর্ট জমা দেন। তিনি ফলতার ৩০টি বুথে পুনর্নির্বাচনের প্রস্তাব দিলেও কমিশন শেষ পর্যন্ত মগরাহাট পশ্চিমের ১১টি এবং ডায়মন্ড হারবারের ৪টি বুথেই ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ফলতাকে এই তালিকা থেকে বাদ রাখা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে।

শনিবার সকাল থেকেই ভোটারদের ব্যাপক উৎসাহ চোখে পড়ে। প্রখর গ্রীষ্মের দাবদাহ উপেক্ষা করে মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী:

গড় ভোটদান : ৮৬.৯০ শতাংশ

মগরাহাট পশ্চিম : ৮৬.১১ শতাংশ

ডায়মন্ড হারবার : ৮৭.৬০ শতাংশ

যে বুথগুলোতে ভোট হয়েছে :

মগরাহাট পশ্চিমে উত্তর ইয়ারপুর এফপি স্কুল (বুথ ৪৬), নাজরা এফপি স্কুল (বুথ ১২৬, ১২৭), দেউলা এফপি স্কুল (বুথ ১২৮), ঘোলা নোয়াপাড়া গার্লস হাই স্কুল (বুথ ১৪২), একতারা মলয়া এফপি স্কুল (বুথ ২১৪, ২১৫, ২১৬) এবং বাহিরপুয়া কুরকুরিয়া এফপি স্কুল (বুথ ২৩০, ২৩১, ২৩২)। ডায়মন্ড হারবারে বাগদা জুনিয়র হাই স্কুল (বুথ ১১৭), চাঁদা এফপি স্কুল (বুথ ১৭৯), হরিদেবপুর এফপি স্কুল (বুথ ১৯৪) এবং রায়নগর এফপি স্কুল (বুথ ২৪৩)।

ভোটগ্রহণ মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ দাবি করা হলেও মগরাহাট পশ্চিমের নাজরা এফপি স্কুলে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায়। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা অতর্কিতে তাঁদের দলীয় ক্যাম্পে ভাঙচুর চালিয়েছে। বসার চেয়ার ভেঙে পাশের পুকুরে ফেলে দেওয়া এবং দলীয় পতাকা ছিঁড়ে ফেলার মতো অভিযোগও ওঠে। তৃণমূল কর্মীদের দাবি, জওয়ানেরা তাঁদের লক্ষ্য করে কুরুচিকর মন্তব্য করেছে এবং গুলি করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে।

একইভাবে ডায়মন্ড হারবারের ১৭৯ নম্বর বুথেও উত্তেজনা ছড়ায়। সেখানে এক বিশেষ ভাবে সক্ষম ভোটার ও তাঁর মাকে হেনস্থা করার অভিযোগ ওঠে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে। তৃণমূল নেত্রী মনমোহিনী বিশ্বাস ও মুখপাত্র প্রতীক উর রহমানের নেতৃত্বে স্থানীয় বাসিন্দারা বুথের অদূরে বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের দাবি, মানবিক কারণে সহায়তা করতে আসা বৃদ্ধা মাকে জওয়ানেরা দীর্ঘক্ষণ বুথের ভেতরে আটকে রেখে মানসিক হেনস্থা করেছেন।

ডায়মন্ড হারবারের ২৪৩ নম্বর বুথ অর্থাৎ রায়নগর অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এদিন সকাল থেকেই ছিল লম্বা লাইন। তবে ভোট চলাকালীন ইভিএমে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সাময়িকভাবে ভোটগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভোটারদের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হলেও প্রযুক্তিগত দল দ্রুত পৌঁছে সমস্যার সমাধান করে।

অশান্তি ও উত্তেজনার মাঝেই মগরাহাট পশ্চিমের ১২৬ নম্বর বুথে দেখা গেল এক মানবিক ছবি। চলাফেরায় অক্ষম আয়সা খাতুন তাঁর ভাইঝির কাঁধে ভর দিয়ে ভোট দিতে আসেন। তিনি বলেন, “২৯ তারিখেও ভোট দিয়েছিলাম। আজ আবার শুনলাম ভোট হবে, তাই ফের এলাম। আমাদের কাজ ভোট দেওয়া, সেটাই করছি।”

মগরাহাট ও ডায়মন্ড হারবারে ভোট চললেও ফলতা বিধানসভা এলাকায় ছিল প্রতিবাদের সুর। পুনর্নির্বাচনের তালিকা থেকে ফলতাকে বাদ দেওয়ায় স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। পাশাপাশি সেখানকার মহিলারা তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকির অভিযোগ তুলেছেন। এক মহিলার অভিযোগ, “তৃণমূলের ইসরাফিল চৌকিদার আমাদের হুমকি দিচ্ছে যে, বিরোধীরা জিতলে আমাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হবে এবং রক্তপাত ঘটবে।” পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফলতা এলাকায় অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট মেটানোর দাবি প্রশাসন করলেও, দ্বিতীয়বার ভোট দেওয়ার কারণ নিয়ে ভোটারদের বড় অংশের মধ্যে বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচন কমিশনের নিযুক্ত পর্যবেক্ষক বুথ পরিদর্শন করলেও পুনর্নির্বাচনের নির্দিষ্ট কারণ নিয়ে সাংবাদিকদের কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি।

শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১৫টি বুথেই কড়া নজরদারিতে ভোট প্রক্রিয়া শেষ হয়। পুনর্নির্বাচনেও এই বিপুল ভোটদান যেমন সাধারণ মানুষের গণতন্ত্রের প্রতি আস্থার প্রতীক, তেমনই শাসক ও বিরোধী উভয় শিবিরের অভিযোগের পাহাড় কমিশনের নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনিক তৎপরতাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ভোট মিটলেও ‘স্পাই ক্যামেরা’ বা ‘ইভিএম কারচুপি’র মতো অভিযোগগুলো আগামী গণনা পর্ব পর্যন্ত রাজনৈতিক উত্তাপ বজায় রাখবে বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।

হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি




 

 rajesh pande