
নয়াদিল্লি, ২৬ মে (হি.স.) : ভারত, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের চতুষ্কোণীয় জোট ‘কোয়াড’-এর বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকে এবার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এল হরমুজ প্রণালী ও পশ্চিম এশিয়ার সামুদ্রিক পরিস্থিতি। বিশেষ করে ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে চলাচল বাধাগ্রস্ত করে বা নিয়ন্ত্রণ ও টোল ব্যবস্থা আরোপের চেষ্টা করে, তবে তার বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে—এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অংশগ্রহণকারী দেশগুলি।
জানা গেছে , যদিও কোয়াডের মূল কার্যক্ষেত্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল, তবুও এই অঞ্চলের বহু দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরের মুক্ত নৌচলাচলের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন (
ইউএনসিএলওএস ) অনুসারে নিরবচ্ছিন্ন নৌচলাচল বজায় থাকাই বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বৈঠকে মত উঠে আসে। এই এলাকায় কোনও ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে তা শুধু ভারত, জাপান বা অস্ট্রেলিয়া নয়, গোটা বিশ্বের বাণিজ্য ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে বলেও আলোচনায় উল্লেখ করা হয়।
আরও জানা গেছে , এই বিষয়টি মাথায় রেখেই কোয়াডের ১১-তম বিদেশমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় উঠে আসে, যদি কোনও আঞ্চলিক শক্তি জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ বা শুল্ক আদায়ের চেষ্টা করে, তবে ভবিষ্যতে অন্য অঞ্চলেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা দিতে পারে, যা আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি।
এই প্রেক্ষাপটে বৈঠকে সামুদ্রিক নজরদারি সহযোগিতা ও সামুদ্রিক ডোমেন সচেতনতা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যৌথ বিবৃতিতে এই উদ্যোগগুলো মূলত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বলা হলেও ভবিষ্যতে প্রয়োজনে এর পরিধি বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইন্দো-প্যাসিফিক এনার্জি সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ নিয়েও আলোচনা হয়, যার লক্ষ্য জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখা।
কোয়াডের যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক নজরদারি সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য নতুন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক মেরিটাইম সার্ভেইল্যান্স কোঅপারেশন ইনিশিয়েটিভ’ চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান এবং সামুদ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হবে। প্রাথমিকভাবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের আদান-প্রদান ও টেবিলটপ এক্সারসাইজের মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানো হবে।
আরও জানানো হয়েছে, কোয়াড দেশগুলো ইন্দো-প্যাসিফিক মেরিটাইম ডোমেন অ্যাওয়ারনেস পার্টনারশিপের আওতায় তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। একটি সমন্বিত অপারেশনাল ছবি তৈরি করার কাজও চলছে, যাতে পুরো অঞ্চলের জাহাজ চলাচল সম্পর্কে রিয়েল টাইম তথ্য পাওয়া যায়।
বিদেশ মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব (আমেরিকা ও কানাডা) কে. নাগরাজ নায়ডু সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, বৈঠকে কোয়াড এজেন্ডার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, কোয়াড এখন একটি বাস্তবমুখী ও কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে, যা এই অঞ্চলে বাস্তব সুবিধা দিচ্ছে।
তিনি আরও জানান, আলোচনার মূল চারটি স্তম্ভ ছিল—সামুদ্রিক ও সীমান্ত নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি, এবং মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলা।
নায়ডু বলেন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সংযোগ ব্যবস্থা এবং নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোয়াডের নতুন সামুদ্রিক নজরদারি জোট আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিয়েল টাইম তথ্য বিনিময় এবং জাহাজ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে।
তিনি স্বীকার করেন, বৈঠকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সরবরাহ শৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একইসঙ্গে নৌচলাচলের স্বাধীনতা, বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
নায়ডু বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জলপথে বাধা বাড়ছে, যা জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এই কারণেই কোয়াড দেশগুলো যৌথভাবে কাজ করে মুক্ত নৌচলাচল ও নিরাপদ বাণিজ্য নিশ্চিত করার বিষয়ে একমত হয়েছে।
বৈঠকে আরও ঘোষণা করা হয়েছে ‘কোয়াড ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ইনিশিয়েটিভ ফ্রেমওয়ার্ক’, যার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করা হবে। পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের যোগাযোগ প্রযুক্তি ও ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা নিয়েও সহযোগিতার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রেও কোয়াড তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। একইসঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য দ্রুত দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে নায়ডু জানান, এটি কোয়াড সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সীমান্ত-পার সন্ত্রাসবাদসহ সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের তীব্র নিন্দা করা হয়েছে এবং ২০২৫ সালের পহেলগাঁও হামলার বিশেষভাবে নিন্দা জানানো হয়েছে। সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ও তাদের অর্থায়নের বিরুদ্ধে কঠোর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য