
কলকাতা, ২৭ মে (হি.স.): রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পরেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ চালুর সিদ্ধান্ত নিল বর্তমান শাসক দল। বুধবার নবান্নে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা করে রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, এবার থেকে উপযুক্ত মহিলারা মাসিক ৩০০০ টাকা হারে আর্থিক সহায়তা পাবেন, যা আগে ছিল ১৫০০ টাকা। প্রথম রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকেই এই ঐতিহাসিক প্রকল্পে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে সরকারের দাবি।
প্রশাসনিক সূত্রে জানানো হয়েছে, এত দিন পর্যন্ত ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের প্রাপকদের তালিকাকেই এই নতুন ব্যবস্থার প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এই নিয়ে বহু অভিযোগ জমা পড়ে। সরকারের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গিয়েছে কিংবা নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি অসম্পূর্ণ— এমন বহু ব্যক্তিও এই ভাতা পাচ্ছিলেন। তবে সিএএ-তে আবেদনকারী বা যাঁদের আবেদন বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করতে এবং সম্পূর্ণ নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া শুরু করতে বুধবার একটি বিশেষ ফর্ম চালু করা হয়েছে। মহিলা ও শিশু কল্যাণ দফতরকে এই কাজের নোডাল সংস্থার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র দফতর (হোম ডিপার্টমেন্ট), ওয়েবেল এবং তথ্যপ্রযুক্তি দফতরও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো একটি সম্পূর্ণ “পরিচ্ছন্ন তালিকা” তৈরি করা।
সরকারি হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে রাজ্যে প্রায় ২ কোটি মহিলা ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর সুবিধা পান। যার মধ্যে প্রায় ৩০ লক্ষ নাম “অযোগ্য বা ভুয়ো” বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই সব নাম বাদ দিয়ে প্রকৃত উপভোক্তাদের নতুন তালিকা তৈরি করা হবে। তবে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, নতুন প্রকল্পে নাম নথিভুক্তির কাজ সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরনো প্রকল্পের অর্থ নিয়মিত মিলবে।
সরকার জানিয়েছে, আগামী ১ জুন থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ কার্যকর হতে চলেছে। আপাতত আগামী ৯০ দিন ধরে চলবে নাম নথিভুক্তিকরণ ও স্ক্রুটিনি বা যাচাই প্রক্রিয়া। অনলাইন এবং অফলাইন— দুই মাধ্যমেই আবেদন করা যাবে। বিডিও অফিস, পুরসভা এবং বড় বড় শহরে ওয়ার্ডভিত্তিক শিবিরের মাধ্যমে ফর্ম জমা নেওয়া হবে। এমনকি পঞ্চায়েত স্তরে সরকারি কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়েও আবেদনপত্র পূরণে সাহায্য করবেন। এর পাশাপাশি আগামী ১৫, ১৬ এবং ১৭ তারিখে বিশেষ ‘জনকল্যাণ শিবির’-এর আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে সাধারণ মানুষ ফর্ম পূরণ করতে পারবেন এবং তাঁদের যাবতীয় বিভ্রান্তি দূর করার সুযোগ পাবেন। স্থানীয় বিধায়কদেরও বিডিও অফিসের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এই কাজে সাহায্য করার দায়িত্ব দেওয়া হবে।
সরকারের দাবি, এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু আর্থিক সহায়তা প্রদানই নয়, বরং প্রতিটি পরিবারের একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার (ডেটাবেস) তৈরি করা। এই তথ্যের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি আগামী জুলাই মাস থেকে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পের কার্ড বিলিও শুরু হতে পারে বলে এ দিন জানানো হয়েছে। কেন্দ্রের সঙ্গে আগামী ৮ তারিখে এই সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিনের সাংবাদিক বৈঠকে একাধিক “ভুয়ো প্রাপকের” উদাহরণও তুলে ধরে প্রশাসন। বহরমপুরের ‘রাকিবুল শেখ’ নামে এক ব্যক্তির ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ পাওয়ার অভিযোগ সামনে এনে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট এই প্রকল্পেও বিপুল বেনোজল ঢুকে পড়েছে। আর সেই কারণেই এই কঠোর যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার তদারকির দায়িত্বে থাকছেন বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। প্রতি মঙ্গলবার তিনি সাংবাদিক বৈঠক করে কত জনের যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো, তা খতিয়ান সহকারে জানাবেন। প্রশাসন আশা করছে, আগামী এক মাসের মধ্যেই উপভোক্তাদের একটি বৃহৎ অংশের যাচাই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা সম্ভব হবে।
হিন্দুস্থান সমাচার / শুভদ্যুতি দত্ত