
ডায়মন্ড হারবার, ১৯ আগস্ট (হি. স.): দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবারে প্রস্তাবিত নদী সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পকে ঘিরে এবার কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠল। বুধবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার থানায় এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস ওরফে ববি। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন, নির্মাণকাজ এবং পরবর্তী সংস্কার সংক্রান্ত বিষয় খতিয়ে দেখে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগে ক্যাগ রিপোর্টের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণেরও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ডায়মন্ড হারবারে নদী সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রকল্পটির প্রাথমিক আনুমানিক ব্যয় ছিল প্রায় ৭.১৭ কোটি টাকা। সেই সময় ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাসের অভিযোগ, প্রকল্পটির সঙ্গে তৎকালীন সাংসদের সরাসরি যোগ ছিল। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তের বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে।
প্রকল্পের জন্য যে জমি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা সেচ ও জলসম্পদ দফতরের অধীনে ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ চলাকালীন ২০১৯ সালে ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক সংলগ্ন নদীবাঁধে বড়সড় ধস নামে। নদীর পাড়ের একটি বিস্তীর্ণ অংশ ভেঙে পড়ে এবং প্রকল্পের নির্মিত অংশেরও উল্লেখযোগ্য অংশ নদীগর্ভে চলে যায় বলে অভিযোগকারীর দাবি।
এই ঘটনার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে ফের সংস্কারের কাজ শুরু হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজে পিডব্লিউডি-এর মাধ্যমে প্রায় ১৩.১৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। ফলে প্রাথমিকভাবে যে প্রকল্পের জন্য প্রায় ৭.১৭ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল, পরবর্তী সময়ে নদীবাঁধ ও সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামো সংস্কারের জন্য আরও বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ খরচ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বিজেপি।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত একটি বেসরকারি সংস্থা তাদের প্রাপ্য টাকা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। সংস্থাটির দাবি ছিল, তাদের প্রায় ২.৫৯ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পিডব্লিউডি-এর তরফে প্রায় ১.২৯ কোটি টাকা প্রদান করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
অন্যদিকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশের পর ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থা প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে চলে যায় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। কেন প্রকল্পের কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেল, কাজের মান নিয়ে কী ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশের প্রকৃতি কী ছিল—এই সমস্ত বিষয়ও তদন্ত করে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
বিজেপি নেতার অভিযোগ, প্রকল্প শুরু করার আগে সয়েল টেস্টিং, ল্যান্ড সার্ভে এবং হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে করা হয়েছিল। অর্থাৎ, নদীর পাড়ের মাটি, জমির প্রকৃতি এবং জলস্তর ও নদীর গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা করা হয়েছিল বলেই দাবি। কিন্তু সেই সমীক্ষার পরও কেন নদীবাঁধে বড়সড় ধস নামল এবং প্রকল্পের নির্মিত অংশ নদীতে তলিয়ে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
অভিযোগকারীর বক্তব্য, কোনও সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রকল্পের পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত সমীক্ষা, নির্মাণকাজের মান এবং অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর ধারে সৌন্দর্যায়নের মতো প্রকল্পে নদীর স্রোত, জোয়ার-ভাটা, মাটির স্থায়িত্ব এবং বাঁধের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলি বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, এই বিষয়গুলির কোনও এক বা একাধিক ক্ষেত্রে গাফিলতি হয়ে থাকতে পারে।
সিএজি রিপোর্টের উল্লেখ করে বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ ব্যয় এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। সরকারি অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, প্রকল্পের কাজের বাস্তব অগ্রগতি কতটা ছিল এবং পরবর্তীতে কেন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে সংস্কারের প্রয়োজন হল—এসব বিষয় নথিপত্রের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
এই অভিযোগকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অভিযোগটি কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতেই করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, তদন্ত হলে প্রকল্পের বাস্তব চিত্র সামনে আসবে এবং কোথাও আর্থিক অনিয়ম হয়ে থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / পার্সতি সাহা