
আগরতলা, ১২ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : একদিকে হুইলচেয়ারের অভাবে অসহায় রোগীদের টুল কিংবা অন্যের সাহায্য নিয়ে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে যাতায়াত করতে হচ্ছে। অন্যদিকে সেই হাসপাতালেরই চত্বরে আবর্জনা ও পরিত্যক্ত সামগ্রীর স্তূপের মধ্যে পড়ে রয়েছে একাধিক হুইলচেয়ার! সরকারি হাসপাতালের এমন পরস্পরবিরোধী চিত্র সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠেছে—রোগীদের ব্যবহারের জন্য থাকা হুইলচেয়ারগুলি কেন এভাবে অবহেলায় পড়ে রয়েছে? সামান্য মেরামতের প্রয়োজন থাকলে সেগুলি মেরামত করে ব্যবহারযোগ্য করার উদ্যোগই বা নেওয়া হচ্ছে না কেন?
রাজ্যের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্রগুলির অন্যতম জিবিপি হাসপাতালের পরিষেবা নিয়ে মাঝেমধ্যেই নানা অভিযোগ সামনে আসে। বিশেষ করে রোগীদের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত হুইলচেয়ার না থাকার বিষয়টি সম্প্রতি আলোচনায় আসে। হুইলচেয়ারের অভাবে অসুস্থ ও শারীরিকভাবে অক্ষম রোগীদের চরম দুর্ভোগের ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শনিবার হাসপাতাল চত্বরে আরও একটি চাঞ্চল্যকর ছবি ধরা পড়ল।
হাসপাতালের এক কোণে বিভিন্ন পরিত্যক্ত ও ব্যবহৃত সামগ্রী স্তূপ করে রাখা হয়েছে। আর সেই স্তূপের মধ্যেই চোখে পড়ে একাধিক হুইলচেয়ার। হাসপাতালের রোগীদের জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারযোগ্য হওয়ার কথা যে সামগ্রীর, সেগুলিই পড়ে রয়েছে কার্যত আবর্জনার স্তূপে। দৃশ্যটি দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, হুইলচেয়ারগুলি আদৌ নষ্ট হয়ে গিয়েছে, নাকি মেরামত না করেই ফেলে রাখা হয়েছে?
যদি হুইলচেয়ারগুলির সামান্য মেরামতের প্রয়োজন থাকে, তাহলে সেগুলি মেরামত করে রোগীদের পরিষেবায় ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না কেন—এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে। কারণ হাসপাতালের একদিকে যখন হুইলচেয়ারের সংকটের অভিযোগ, তখন অন্যদিকে একই হাসপাতালের চত্বরে একাধিক হুইলচেয়ার পড়ে থাকা নিঃসন্দেহে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় ও নজরদারির অভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন রোগীর পরিজনদের একাংশ।
রোগীর পরিজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে আসা অনেক রোগীই শারীরিকভাবে দুর্বল কিংবা গুরুতর অসুস্থ থাকেন। তাঁদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে হুইলচেয়ার অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু প্রয়োজনের সময় হুইলচেয়ার না পেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীদের টুলে বসিয়ে বা টুলের সাহায্যে নিয়ে যেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতাল চত্বরে হুইলচেয়ার পড়ে থাকার দৃশ্য আরও বেশি হতাশাজনক।
এদিকে হাসপাতালের অভ্যন্তরে সরকারি সামগ্রী সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। রোগীর পরিজনদের একাংশের দাবি, হাসপাতালের বিভিন্ন সামগ্রী নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করে কোনটি ব্যবহারযোগ্য, কোনটি মেরামতযোগ্য এবং কোনটি সম্পূর্ণ অকেজো—তা চিহ্নিত করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু বাস্তবে সেই নজরদারি কতটা কার্যকর, শনিবারের দৃশ্যই তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
শুধু তাই নয়, স্থানীয় মহল ও হাসপাতাল চত্বরে আসা মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের কানাঘুষো রয়েছে। অভিযোগ উঠছে, হাসপাতালের কিছু কর্মী ভালো থাকা সামগ্রীকেও নষ্ট বা অকেজো বলে দেখিয়ে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া কিংবা বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগটি তদন্ত করে দেখার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
রোগীর পরিজনদের বক্তব্য, সরকারি হাসপাতালের প্রতিটি সামগ্রীই জনগণের অর্থে কেনা। ফলে একটি হুইলচেয়ারও শুধুমাত্র হাসপাতালের সম্পত্তি নয়, সেটি সাধারণ মানুষের সম্পদ। সেই সম্পদ যদি মেরামতযোগ্য অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তার দায়ভার কার—এই প্রশ্নের জবাব কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।
হাসপাতালের মেডিকেল সুপার ডাঃ বিধান গোস্বামী এবং আরএমও ডাঃ বিকাশ দেববর্মার নজরের বাইরে কীভাবে একাধিক হুইলচেয়ার দীর্ঘদিন ধরে পড়ে রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রোগীর পরিজনদের দাবি, বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখে পরিত্যক্ত হুইলচেয়ারগুলির অবস্থা পরীক্ষা করা হোক। ব্যবহারযোগ্য হলে অবিলম্বে সেগুলি রোগীদের পরিষেবায় ফিরিয়ে দেওয়া হোক এবং মেরামতের প্রয়োজন হলে দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করা হোক।
জিবিপি হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীদের ন্যূনতম পরিষেবা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের অন্যতম দায়িত্ব। সেখানে একদিকে হুইলচেয়ারের অভাবে রোগীদের টুলে ভর করে চলতে হবে, আর অন্যদিকে হাসপাতাল চত্বরেই হুইলচেয়ার পড়ে থাকবে আবর্জনার স্তূপে—এই ছবি নিঃসন্দেহে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ