
নয়াদিল্লি, ২৫ সেপ্টেম্বর (হি. স.) : দেশের তরুণ প্রজন্মকে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীলতার মনোভাব বজায় রেখে স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনা করা, যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রশ্ন তোলার আহ্বান জানালেন উপ-রাষ্ট্রপতি সি. পি. রাধাকৃষ্ণন। শুক্রবার তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, প্রশ্ন তোলা গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলেও সেই প্রশ্ন হওয়া উচিত দেশের ইতিবাচক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে, অগ্রগতিতে কোনো বাধা বা ব্যবধান সৃষ্টির জন্য নয়।
নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত শ্রী রাম কলেজ অফ কমার্স -এ আয়োজিত তৃতীয় ‘অরুণ জেটলি স্মারক বিতর্ক প্রতিযোগিতা’-র পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দিচ্ছিলেন উপ-রাষ্ট্রপতি। সেখানে তিনি বলেন, “প্রশ্ন উত্থাপন ছাড়া গণতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষা অসম্ভব। তবে যেখানে প্রয়োজন সেখানেই গঠনমূলক প্রশ্ন তোলা উচিত, তা যেন কোনোভাবেই উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি না করে।”
শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তাভাবনার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার আগে নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত— এতে সমাজ ও দেশের কোনো বাস্তব কল্যাণ হবে কি না। তরুণদের মধ্যে এই দায়িত্বশীল ভাবনা গড়ে উঠলে ২০৪৭ সালের অনেক আগেই ভারত একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য (চ্যান্সেলর) হিসেবে রাধাকৃষ্ণন এসআরসিসি-র গৌরবময় ১০০ বছর পূর্তিতে গভীর অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের এক শতাব্দীর যাত্রা কেবল কালের হিসাব নয়, বরং তার বলিষ্ঠ চরিত্রের স্বাক্ষর। প্রতিষ্ঠানগুলি তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন তারা নিজেদের মূল আদর্শকে আঁকড়ে ধরে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের রূপান্তর ঘটায়।
প্রখ্যাত রাষ্ট্রনেতা প্রয়াত অরুণ জেটলির স্মৃতিচারণ করে উপ-রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি ছিলেন এসআরসিসি-র এক উজ্জ্বল প্রাক্তন ছাত্র, অনন্য রাজনীতিক ও প্রজ্ঞাবান প্রবক্তা। জেটলির মধ্যে আইনি প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অসাধারণ যোগাযোগ দক্ষতার এক দুর্লভ সংমিশ্রণ ছিল। জিএসটি, ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপসি কোড, কর সংস্কার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে জেটলির ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করেন তিনি।
উপ-রাষ্ট্রপতি আরও জানান যে, বিরোধ বা দ্বিমত এড়িয়ে গেলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না; বরং যুক্তি, তথ্য ও আলোচনার মাধ্যমে ভিন্ন মতের মোকাবিলা করলেই গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় হয়। গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য বাকস্বাধীনতা, প্রতিপক্ষের মতকে শ্রদ্ধা জানানো এবং সঠিক সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রাখা একান্ত কাম্য।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-র দ্রুত প্রসারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রাধাকৃষ্ণন বলেন, এআই-জনিত নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জকে বিশাল সম্ভাবনায় রূপান্তর করা সম্ভব। অতীতে কম্পিউটার আসার সময়েও বিপুল কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ক্ষেত্রের অভূতপূর্ব রূপান্তরের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি জানান, রাজ্যসভা সংবিধানের অষ্টম তফসিলভুক্ত সমস্ত ভারতীয় ভাষায় এআই-ভিত্তিক রিয়েল-টাইম অনুবাদ ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্যে দ্রুত গতিতে কাজ করছে।
তবে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, কোনো অ্যালগরিদম যেন মানুষের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ও বিবেকের জায়গা নিতে না পারে। “মানুষের সহজাত সৃজনশীলতার স্থান এআই কখনোই পূরণ করতে পারবে না,” মন্তব্য করে তিনি শিক্ষার্থীদের পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সাথে খাপ খাইয়ে অনবরত শেখার পরামর্শ দেন।
পরিশেষে উপ-রাষ্ট্রপতি জানান, এসআরসিসি-র শতবর্ষ আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে প্রতিষ্ঠানগুলি তখনই মহৎ হয়ে ওঠে, যখন প্রতিটি নতুন প্রজন্ম তাকে পূর্ববর্তী অবস্থার চেয়েও উন্নত ও সমৃদ্ধ করে রেখে যায়। এদিনের অনুষ্ঠানে তিনি বিজয়ী প্রতিযোগীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন এবং সমসাময়িক বিষয়ে তাঁদের উপস্থাপিত যুক্তিনিষ্ঠ বক্তব্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্টজনের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক যোগেশ সিং, এসআরসিসি-র গভর্নিং বডির সভাপতি অজয় এস. শ্রীরাম, অধ্যক্ষ অধ্যাপক সিমরিত কৌর এবং প্রয়াত অরুণ জেটলির সহধর্মিণী সঙ্গীতা জেটলি সহ বহু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি