
গুয়াহাটি, ১৯ ফেব্রুয়ারি (হি.স.) : রাজ্যে অস্থিরতা ও দ্বিধার পরিবেশ দূর করে শান্তি ও সম্প্রীতির আবহ গড়ে তুলতে সরকার সফল হয়েছে। গত পাঁচ বছরে বিচক্ষণ আর্থিক ব্যবস্থাপনা, উন্নত নীতি অনুসরণ এবং রাজ্যের নিজস্ব সম্পদ সংগ্রহের সক্ষমতা জোরদারের ফলে অসম আজ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অসম এখন রূপান্তরের রাজ্য, আর পেছনে ফিরে যাবে না, এখন চোখ মাউন্ড এভারেস্টের দিকে। পঞ্চদশ অসম বিধানসভার বাজেট অধিবেশনের শেষ দিনে আজ বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা রাজ্যপালের ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের উত্তরে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে কথাগুলি বলছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা ও নিয়োগের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ মানদণ্ড রক্ষা করেছে রাজ্য সরকার। তিনি বলেন, জাতির কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে শক্তি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থেকেও সরকার রূপান্তরের পথে অগ্রসর হয়েছে। ‘অসম আর পিছনে ফিরে তাকাবে না, এখন আমাদের দৃষ্টি মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতায়’, এভাবেই তিনি আগামীর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।
রাজনৈতিক যাত্রার স্মৃতিচারণ :
বিধানসভার শেষ দিনে নিজের সমাপনী ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ২৫ বছরের বিধায়ক জীবনের কথা স্মরণ করেন। প্রথমবার ১৯৯৬ সালে নির্বাচন লড়ে ১৭ হাজার ভোটে পরাজিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, ২০০১ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে জয়ী হয়ে আসছেন এবং প্রতিবারই ভোটের ব্যবধান বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘যারা আমাকে ভোট দেননি, তাঁরা আমার শত্রু নন।’ জনপ্রতিনিধিদের সকলের সেবা করার আহ্বান জানান হিমন্তবিশ্ব শৰ্মা।
অর্থনৈতিক অগ্রগতি :
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদে অসম দেশের দ্রুততম বিকাশশীল রাজ্যগুলির অন্যতম হয়ে উঠেছে। ষষ্ঠদশ অর্থ কমিশন অসমের ভাগ ৩.২৫৮ শতাংশে উন্নীত করেছে, যার ফলে আগামী বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি কেন্দ্রীয় অনুদান আসবে।
অসমের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ১৬.৯৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে এবং রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ৮,৭১,৪৫১ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। এই প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে অসম ১০ লক্ষ কোটি টাকার অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জনমুখী সাফল্য :
মুখ্যমন্ত্রী জানান, গত পাঁচ বছরে রাজ্যের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবর্ষে যা ছিল ৮৬,৯৪৭ টাকা, তা ২০২৫-২৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৮৫,৪২৯ টাকায়, অর্থাৎ ১১৩ শতাংশ বৃদ্ধি। রাজ্যের নিজস্ব কর সংগ্রহও ১৩ শতাংশের বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪-২৫ সালে ৩০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।
বিদ্যুৎ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন ২২-২৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কপিলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন শীঘ্রই হবে এবং কারবি আংলং এলাকায় বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে।
নিয়োগ ও কর্মসংস্থান :
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এক লক্ষ সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতির বদলে পাঁচ বছরে প্রায় ১ লক্ষ ৬৫ হাজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, জানান তিনি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষা বিভাগে আগামী দু-বছরে আরও ৫৫ হাজার নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে তিনি স্বীকার করেন, কেবল সরকারি চাকরির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয়। শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘অ্যাডভান্টেজ অসম’ কর্মসূচির মাধ্যমে বৃহৎ বিনিয়োগ এলে রাজ্যের যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের জন্য বাইরে যেতে হবে না।
সামাজিক উন্নয়ন ও আইন-শৃঙ্খলা :
অরুণোদয় প্রকল্প, মহিলা উদ্যোক্তা প্রকল্প, আত্মনির্ভর অসম অভিযান এবং চা-বাগানের শ্রমিকদের জমির পাট্টা প্রদান সহ একাধিক জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।
আইন-শৃঙ্খলার উন্নতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে ধেমাজির বোমা বিস্ফোরণের মতো ঘটনায় ক্ষতবিক্ষত অসমে গত দশ বছরে আর কোনও বোমা বিস্ফোরণ ঘটেনি।
তিনি বলেন, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মাত্র দু-বার অসম সফর করেছিলেন, অথচ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বছরে চার-পাঁচবার অসমে আসেন।
সবশেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অসম আর পেছনে ফিরে তাকাবে না। আগামী পাঁচ বছরে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করে, জননী জন্মভূমির সুরক্ষার সংকল্প নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। এই বিধানসভার ভূমিকা ইতিহাস শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস