
কলকাতা, ১৮ এপ্রিল ( হি. স.) : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আবহে প্রচারের পারদ তুঙ্গে তুলতে শনিবার রাজ্যে ঝোড়ো সফর করলেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। এদিন উত্তরবঙ্গের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের বাঁকুড়া পর্যন্ত একাধিক জনসভা ও রোড-শো’র মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ আক্রমণ শানান তিনি। তাঁর ভাষণে উঠে আসে উত্তরপ্রদেশ মডেল, আইন-শৃঙ্খলা, বুলডোজার নীতি এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি।
শনিবার কোচবিহারের মাথাভাঙা এবং জলপাইগুড়ির ধূপগুড়িতে দলীয় প্রার্থীদের সমর্থনে জনসভা করেন যোগী আদিত্যনাথ। ধূপগুড়ির ফণীর মাঠে বিজেপি প্রার্থী নরেশ চন্দ্র রায়ের সমর্থনে আয়োজিত সভায় তিনি উত্তর প্রদেশের আদলেই পশ্চিমবঙ্গ গড়ার হুঁশিয়ারি দেন। বক্তব্যের শুরুতে জল্পেশ মন্দিরের মহাদেব এবং বীর চিলা রায়কে শ্রদ্ধা জানিয়ে যোগী আক্রমণাত্মক মেজাজে বলেন, “২০১৭ সালের আগে উত্তরপ্রদেশেও দাঙ্গা হতো, দুর্গাপূজা করা যেত না। আজ সেখানে সব চাঙ্গা। লাভ জিহাদ নেই, রাস্তায় নামাজ নেই, এমনকি মসজিদের আওয়াজও বাইরে যায় না।”
তিনি স্পষ্টভাবে জানান, বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাস্তায় নামাজ পড়া বন্ধ করা হবে এবং মাফিয়া দমনে চালানো হবে ‘বুলডোজার’। তাঁর কথায়, “বুলডোজার শুধু রাস্তা বানায় না, মাফিয়াদের পিষে ফেলতেও জানে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাকে মৌলানাদের ফতোয়ার ক্ষেত্র হতে দেব না।” তৃণমূলকে ‘লুটেরা’ আখ্যা দিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছরে তৃণমূল বাংলাকে শেষ করে দিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীর পাঠানো টাকা তৃণমূল ‘হজম’ করে ফেলছে।
মাথাভাঙার জনসভাতেও যোগী আদিত্যনাথ দাবি করেন যে, রাজ্যে বিজেপি সরকার গড়লে ‘লাভ জিহাদ’ ও ‘ল্যান্ড জিহাদ’ কঠোরভাবে দমন করা হবে। নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম বা মহিলা সংরক্ষণ বিলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তৃণমূল, কংগ্রেস ও বামপন্থীরা নারীদের অধিকার দেওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। বাংলার মাতৃশক্তি আজ রাজনৈতিক সহিংসতা ও দুর্নীতির কারণে অসুরক্ষিত। বাংলার সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে তোষণ ও ভয়ের রাজনীতি থেকে মুক্তি প্রয়োজন বলে তিনি দাবি করেন।
এদিন উত্তরবঙ্গের কর্মসূচি শেষ করে বিকেলে রাঢ়বঙ্গের বাঁকুড়ায় পৌঁছান যোগী আদিত্যনাথ। বাঁকুড়া সদর কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী নীলাদ্রি দানার সমর্থনে আয়োজিত এই রোড-শো ঘিরে শহরজুড়ে ছিল অভূতপূর্ব উন্মাদনা। নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরে হেলিকপ্টারে করে লালবাজার হিন্দু হাইস্কুল মাঠে পৌঁছান তিনি। চড়া রোদ উপেক্ষা করে রাস্তার দু’ধারে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত করেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীকে একঝলক দেখার জন্য।
লালবাজার মোড় থেকে মাচানতলা পর্যন্ত সুসজ্জিত হুডখোলা গাড়িতে চড়ে রোড-শো করেন যোগী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রার্থী নীলাদ্রি দানা এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা সাংসদ সুভাষ সরকার। রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ তাঁকে লক্ষ্য করে ফুল ছোড়েন এবং জয় শ্রীরাম ধ্বনি দেন। মাচানতলা মোড়ে রোড-শো শেষে সংক্ষিপ্ত ভাষণে তিনি বলেন, “বাংলার মাটিতে বন্দে মাতরম্ ও আধ্যাত্মিকতার যে ঐতিহ্য রয়েছে, তৃণমূল তা নষ্ট করেছে। এখানে ‘গো-মাতা কাটনে নেহি দেঙ্গে, হিন্দু কো বাটনে নেহি দেঙ্গে’—এই নীতিতেই সরকার চলা উচিত।” পরিশেষে বাংলায় স্লোগান তুলে তিনি ঘোষণা করেন, “পরিবর্তন দরকার, তাই বিজেপি সরকার।”
সমগ্র দিনের প্রচারে যোগী আদিত্যনাথ বারংবার উত্তর প্রদেশের আইন-শৃঙ্খলার উদাহরণ টেনে বাংলার বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করেন। তাঁর দাবি, বাংলায় পরিবর্তন হলে এটি আবার শিল্প, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দেশের নেতৃত্ব দেবে। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ—এদিন যোগীর প্রতিটি সভাতেই ভিড় ছিল লক্ষ্যণীয়, যা আসন্ন নির্বাচনে গেরুয়া শিবিরের আত্মবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি