বিশ্বকে সঠিক দিশা দেখিয়েছে সনাতন ধর্ম, মঠমন্দির ভারতীয় সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু : সংঘ-প্রধান ভাগবত
- দেশে অভ্যন্তরীণ সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করছে বিশ্বের স্বার্থান্বেষী শক্তি, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান সংঘ-প্রধানের - আগরতলার মোহনপুরে ‘মা চিন্ময়ী সৌন্দর্য মন্দির’ –এ দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা আগরতলা, ২১ এপ্রিল (হি.স.) : সনাতন ধর্ম সমগ্র বিশ্বকে সঠিক দিশা দ
‘মা চিন্ময়ী সৌন্দর্য মন্দির’-এর প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও কুম্ভ-অভিষেক অনুষ্ঠানে বক্তব্য পেশ করছেন ডা. মোহন ভাগবত


অনুষ্ঠানমঞ্চে দুই রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী, রাজমাতা, নেপালের পুরোহিত সহ ডা. ভাগবত


- দেশে অভ্যন্তরীণ সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করছে বিশ্বের স্বার্থান্বেষী শক্তি, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান সংঘ-প্রধানের

- আগরতলার মোহনপুরে ‘মা চিন্ময়ী সৌন্দর্য মন্দির’ –এ দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা

আগরতলা, ২১ এপ্রিল (হি.স.) : সনাতন ধর্ম সমগ্র বিশ্বকে সঠিক দিশা দেখিয়েছে। মঠ-মন্দির ভারতীয় সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। শক্তির পাশাপাশি ভক্তিরও প্রয়োজন। সকলের সঙ্গে মিলেমিশে সবার সেবা করার মানসিকতাকে ভারতীয় সমাজ সম্মান করে, ভারতের সংস্কৃতি এটাই, বক্তা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সরসংঘচালক ডা. মোহন ভাগবত।

আজ মঙ্গলবার পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার অন্তৰ্গত মোহনপুরের ফকিরামুড়া বোয়ালিয়ায় অবস্থিত চিন্ময় মিশন স্কুলে ‘মা চিন্ময়ী সৌন্দর্য মন্দির’-এর প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও কুম্ভ-অভিষেক অনুষ্ঠানে বক্তব্য পেশ করছিলেন সংঘ-প্রধান ডা. ভাগবত।

ত্রিপুরা এবং মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল যথাক্রমে ইন্দ্রসেনা রেড্ডি নাল্লু ও জিষ্ণু দেববর্মা, মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসার (ডা.) মানিক সাহা, রাজমাতা বিভুকুমারী দেবী, রাজ্যের মন্ত্রী রতনলাল নাথ, নেপাল থেকে আগত পুরোহিতদের সঙ্গে নিয়ে চিন্ময় মিশন স্কুল চত্বরে ‘মা চিন্ময়ী সৌন্দর্য মন্দির’-এর প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও কুম্ভ-অভিষেক করছেন ডা. মোহন ভাগবত।

প্রদত্ত বক্তব্যে ডা. ভাগবত চিন্ময়ী হরিহরা বিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদানের উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে উপস্থিতদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। শিক্ষা প্রসঙ্গে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘জ্ঞান মানে শুধু বক্তব্য নয়, জ্ঞান হলো উপলব্ধি।’

তিনি শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে বলেন, ‘জ্ঞানকে অর্থনৈতিক লাভের সাথে এক করে দেখা উচিত নয়। জ্ঞান কেবল এমন কিছু নয় যা একজন ব্যক্তিকে নিজের ভরণপোষণের দক্ষতা দিয়ে সজ্জিত করে, জ্ঞানকে অর্থ উপার্জনের সাথে এক করে দেখা যায় না...’, বলেন ডা. ভাগবত।

ডা. ভাগবত বলেন, ‘কেবল বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এবং অৰ্জিত শিক্ষা অসম্পূর্ণ। শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য বেঁচে থাকা নয়…, প্রকৃত শিক্ষা হলো নিজের ভেতরের অজানাকে জানা এবং নিজের চোখে বিশ্বকে দেখা।’

সংঘ-প্ৰধান বলেন, গত দু-হাজার বছর ধরে বিজ্ঞান থেকে সমাজবাদ পর্যন্ত নানা দর্শনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে বিশ্ব। এখন বিশ্ব উপলব্ধি করছে, জীবনের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিরই আজ প্রয়োজন। সে জন্য আজ বিশ্বের কাছে ভারতের গুরুত্ব বেড়েছে।

প্রাসঙ্গিক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের কতিপয় স্বার্থান্বেষী শক্তি দেশে (ভারত) অভ্যন্তরীণ সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করছে। বিশ্বের স্বার্থপর শক্তিগুলি জানে, ভারতবর্ষ জেগে উঠলে তাদের আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ভারতের উত্থান রুখতে বাহ্যিক শক্তিগুলি বিভাজন সৃষ্টি করে ভারতে অভ্যন্তরীণ সংঘাত সৃষ্টির আপ্রাণ চেষ্টা করছে।’ বলেন, ‘আমার উদাহরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনারা যদি আপনাদের চারপাশ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তা-হলেই বুঝতে পারবেন।’

ডা. ভাগবত বলেন, ‘ভারতের ভাষা, ঐতিহ্য এবং বিশ্বাসের বৈচিত্র্যকে সংঘাতের কারণ হিসেবে না দেখে শক্তির উৎস হিসেবে দেখা উচিত। আমাদের ভাষাগত ঐতিহ্য, খাদ্যাভ্যাস, চিরাচরিত বিশ্বাস, দেবদেবীগণ অনাদিকাল থেকেই বৈচিত্র্যময়। এই বৈচিত্র্যই আমাদের ঐক্যের উদযাপন।’ তিনি বলেন, ‘মানুষকে এই বিষয়টি ভুলিয়ে দিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে লড়াই চালিয়ে যেতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

সংঘ-প্রধান বলেন, ‘সমাজকে অবশ্যই তার সাংস্কৃতিক ভিত্তি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে, ঐক্যের জন্য কাজ করতে হবে। এখনই সময়, সমগ্র সমাজকে আমাদের প্রাচীন জ্ঞান সম্পর্কে সচেতন করে মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া, এই বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও আমরা ঐক্যবদ্ধ।’

ভাষাগত বিবর্তন প্রসঙ্গে ডা. ভাগবত বলেন, ‘সময়ের সাথে সাথে ভাষার সংখ্যা বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক বিষয়। হিন্দির কিছু উপভাষা পূর্ণাঙ্গ ভাষায় পরিণত হয়েছে, এটি উদ্বেগের বিষয় নয়।’ বলেন, দীর্ঘ ইতিহাসসম্পন্ন সভ্যতায় বৈচিত্র্য একটি স্বাভাবিক বিষয়।

সহনশীলতার আহ্বান জানিয়ে ভাগবত বলেন, ‘আমাদের নির্ভীক হতে হবে। সমাজকে সত্যের পথে চলতে সমস্ত পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত করতে হবে আমাদের।’

ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আলোকপাত করে মোহন ভাগবত বলেন, মন্দিরগুলো ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক জীবন, বাণিজ্য এবং শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে, যা সম্প্রদায়ের শক্তি বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ ভারতের চারটি রাজ্য সর্বাধিক সেবামূলক কাজে নিয়োজিত। বহু যুগ ধরে আমাদের মধ্যে বৈচিত্র্য থাকলেও আমরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছি, বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য আমাদের শক্তি।

বৃহত্তর দার্শনিক ধারণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভারতীয় চিন্তাধারা অস্তিত্বের মধ্যে আন্তঃসংযোগকে স্বীকার করে। এটি একটি প্রমাণিত ধারণা যে সবকিছুই আন্তঃসংযুক্ত। বিজ্ঞানও বলে যে সবকিছুই সংযুক্ত, চেতনা স্থানীয় নয়, সার্বজনীন। হতে পারে সবকিছুই একটি পূর্ব-বিদ্যমান চেতনা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। আমাদের প্রাচীন সনাতন ঐতিহ্যে যা দীর্ঘকাল ধরে বোঝা গেছে, বিজ্ঞান তা অন্বেষণ ও যাচাই করে চলেছে।’

ডা. ভাগবত শক্তি ও ভক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে বলেন, ‘ভক্তি ছাড়া শক্তি বিশৃঙ্খলার কারণ হতে পারে। শক্তির সাথে ভক্তিও থাকতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতা প্রায়ই ফলাফল নির্ধারণ করে, কিন্তু এ-ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে খাপ খায় না। আজকের যুগে শুধু সত্যের অধিকারী হওয়াই যথেষ্ট নয়, সেই সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তিরও প্রয়োজন। ভারতের শক্তি নিহিত রয়েছে তার সংস্কৃতিতে। তবুও ভারত কখনও আক্রমণাত্মক মনোভাব পোষণ করেনি, শান্তি ও ভ্রাতৃত্ববোধের ধারক হয়ে এসেছে, যা আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

ভারতের ঋষি-মুনিরা যে দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজের প্রতিটি স্তরে সেবা করেছেন, যার মধ্যে নদী, পাহাড়, পর্বত সহ প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে, সেই মহান উদ্যোগ একদিনে সম্পন্ন হয়নি, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, বলেন আরএসএস-এর সরসংঘচালক ডা. মোহন ভাগবত।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘মা চিন্ময়ী সৌন্দর্য মন্দির’টি মা ত্রিপুরা সুন্দরীকে উৎসর্গ করা হয়েছে। এটি অনন্য স্থাপত্য ও আধ্যাত্মিক নিদর্শন। মন্দিরে রয়েছে তামিলনাড়ু থেকে নিয়ে আসা ২৭টি কালো পাথরের স্তম্ভ। এই স্তম্ভগুলি হিন্দু জ্যোতিষশাস্ত্রের ২৭টি নক্ষত্রের প্রতীক। ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগের প্রতীক হিসেবে মন্দিরটি প্রচলিত ছাদ ছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে মা ত্রিপুরা সুন্দরীর ১৫ ফুট উঁচু কালো এক-পাথরের মূর্তি সহ নিত্য পূজার জন্য মাতাবাড়ি মন্দিরের আদলে তৈরি করা হয়েছে একটি মূর্তি।গ্রানাইট মূর্তি

মন্দির প্রাঙ্গণে দেবী সৌন্দর্য লহরী এবং অন্যান্য ভক্তিমূলক গ্রন্থের শ্লোক খোদাই ও শিলালিপি রয়েছে। এর ফলে মন্দিরের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি করেছে। নেপাল থেকে নির্বাচিত কয়েকজন পুরোহিত মা চিন্ময়ী সৌন্দর্য মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও কুম্ভ-অভিষেক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন।

হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস




 

 rajesh pande