
কলকাতা, ২১ এপ্রিল ( হি. স.) : প্রথম দফার ভোটের প্রচার শেষ হওয়ার দিনটিতে পশ্চিমবঙ্গ চষে বেড়ালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কার্শিয়াং থেকে চণ্ডীপুর, কুলটি থেকে শালবনি—প্রতিটি জনসভা থেকেই তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ শাণান। পাহাড়ের গোর্খা সমস্যার সমাধান থেকে শুরু করে অনুপ্রবেশকারী বিতাড়ন এবং নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
মঙ্গলবার সকালে কার্শিয়াং-এর জনসভা থেকে পাহাড়বাসীর দীর্ঘদিনের আবেগকে স্পর্শ করেন অমিত শাহ। তিনি ঘোষণা করেন যে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠিত হওয়ার পরেই দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে থাকা গোর্খা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে। শাহ বলেন, “আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, ৫ মে বিজেপি সরকার গড়বে এবং ৬ মে-র মধ্যেই গোর্খাদের মুখে সন্তুষ্টির হাসি ফুটবে। আমরা গোর্খাদের ভাবাবেগ মেনেই এমন সমাধান বের করব যা দশকের পর দশক ধরে হওয়া অবিচারের অবসান ঘটাবে।” তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল ও কংগ্রেস বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ের মানুষদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
উত্তরবঙ্গবাসীর দীর্ঘদিনের অভাব-অভিযোগের কথা মাথায় রেখে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জানান, বিজেপি ক্ষমতায় এলে উত্তরবঙ্গে একটি পৃথক এইমস, ৫০০ শয্যার ক্যান্সার হাসপাতাল এবং আইআইটি ও আইআইএম -এর মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। এছাড়া দার্জিলিংকে ইকো-ট্যুরিজম ও হেরিটেজ ট্যুরিজমের বিশ্বমানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি গোর্খা যুবকদের জন্য একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির আশ্বাসও দেন তিনি।
কুলটি ও চণ্ডীপুরের সভা থেকে অমিত শাহের ভাষণে প্রধান ইস্যু ছিল অনুপ্রবেশ। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেন, “মমতা দিদি তাঁর ভোটব্যাঙ্ক বাঁচাতে অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করতে চান। কিন্তু ৫ তারিখ বিজেপি সরকার গড়ার পর বেছে বেছে প্রত্যেক অনুপ্রবেশকারীকে বাংলা থেকে বিতাড়িত করা হবে।” চণ্ডীপুরের সভা থেকে তিনি আশ্বাস দেন যে, সরকার গঠনের ৪৫ দিনের মধ্যে বাংলার সীমানা সম্পূর্ণ সিল করে দেওয়া হবে যাতে আর একজনও অনুপ্রবেশকারী ঢুকতে না পারে।
সন্দেশখালি প্রসঙ্গ টেনে কুলটির সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রীকে তীব্র আক্রমণ করেন শাহ। তিনি বলেন, “মমতা দিদি বলেন রাত ৭টার পর মেয়েদের বেরোনো উচিত নয়। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, ৪ মে-র পর বিজেপি সরকার গঠিত হলে রাত ১টাতেও একটি ছোট মেয়ে স্কুটার নিয়ে নির্ভয়ে ঘুরতে পারবে। কোনও গুণ্ডা চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাবে না।” চণ্ডীপুরের সভা থেকে তিনি তৃণমূল আশ্রিত ‘গুণ্ডাদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছে, ৫ তারিখের পর তাদের পাতাল থেকে খুঁজে বের করে জেলে ভরা হবে।
পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরে অমিত শাহ স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা হবে। তিনি বলেন, “এখানে চারটে বিয়ে বা তিন তালাক চলবে না। আইন সবার জন্য সমান হবে।” পাশাপাশি মুর্শিদাবাদের জনৈক নেতার মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, বাংলার মাটিতে কোনও ‘বাবরি মসজিদ’ তৈরি করতে দেওয়া হবে না। তিনি অভিযোগ করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল তাঁর ‘ভাইপো’কে মুখ্যমন্ত্রী বানানোর লক্ষ্যে রাজনীতি করছেন, সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য নয়।
পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনিতে দাঁড়িয়ে অমিত শাহ প্রতিশ্রুতি দেন যে, জিন্দাল স্টিল প্রকল্পের মতো থমকে যাওয়া শিল্পগুলো একমাত্র মোদী সরকারই সম্পন্ন করতে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ এবং প্রতি বছর স্বচ্ছ পদ্ধতিতে ১ লক্ষ সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এছাড়াও আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি পরিবারকে বছরে ৫ লক্ষ টাকার চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
সব মিলিয়ে, প্রচারের শেষ দিনে অমিত শাহের ম্যারাথন সভাগুলি থেকে বিজেপি স্পষ্ট করে দিল যে, তাদের এবারের লড়াই কেবল সরকার গড়ার জন্য নয়, বরং বাংলার ‘সাংস্কৃতিক ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন’ রোখার লড়াই। এখন দেখার, শাহের এই দীর্ঘ প্রতিশ্রুতির তালিকা ৪ মে-র নির্বাচনী ফলাফলে কতটা প্রতিফলিত হয়।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি