
নয়াদিল্লি/ কলকাতা/চেন্নাই, ২৩ এপ্রিল (হি.স.) : ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় গণতন্ত্রের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফা এবং তামিলনাড়ু বিধানসভার সকল আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। রোদ, আর্দ্রতা এবং তীব্র লু উপেক্ষা করে সকাল থেকে যেভাবে মানুষ বুথমুখী হয়েছেন, তা বিগত কয়েক দশকের রেকর্ডকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। এদিন নির্বাচন কমিশনের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার শেষে গড় ভোটের হার ৯২.১৪ শতাংশ এবং তামিলনাড়ুতে স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ ৮৫.০৩ শতাংশ ভোট রেকর্ড করা হয়েছে। প্রথম দফার ভোট শেষ হতেই জনমানসে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— এই বিপুল ভোটদান কি শাসক দলের পক্ষে স্থিতাবস্থার ইঙ্গিত, নাকি বিরোধীদের পক্ষে পরিবর্তনের হাওয়া?
এদিন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এই অভাবনীয় অংশগ্রহণের জন্য উভয় রাজ্যের ভোটারদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর মানুষ গণতন্ত্রের প্রতি তাঁদের অটুট আস্থার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আগামী ৪ মে নির্ধারিত হবে এই বিপুল জনমতের চূড়ান্ত রাজনৈতিক ফলাফল।পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে বৃহস্পতিবার প্রথম দফার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। উত্তরবঙ্গের হিমালয়ের পাদদেশ দার্জিলিং ও কালিম্পং থেকে শুরু করে জঙ্গলমহল এবং সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলিতে এদিন সকাল থেকেই উৎসবের মেজাজ লক্ষ্য করা গেছে।
এদিন প্রথম দফায় প্রায় ৩.৬ কোটি ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য ৪৪,৩৭৬টি বুথ তৈরি করেছিল কমিশন। এর মধ্যে ৫৬৪৪টি বুথ সম্পূর্ণভাবে মহিলা কর্মীরা পরিচালনা করেন, যা রাজ্যে নারী শক্তির এক বলিষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী রাজ্যে গড় ভোটদান ছিল ৮৯.৯৩ শতাংশ, যা রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ৯২ শতাংশের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। এটি ২০২১ সালের বিধানসভা (৮৩.২%) এবং ২০২৪ সালের লোকসভা (৭৯.৮%) নির্বাচনের পরিসংখ্যানকেও অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। জেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দক্ষিণ দিনাজপুর ৯৩.১২ শতাংশ ভোট দিয়ে রাজ্যে শীর্ষে রয়েছে। এছাড়া কোচবিহার (৯২.০৭%), বীরভূম (৯১.৫৫%), মুর্শিদাবাদ (৯১.৩৬%) এবং জলপাইগুড়িতেও (৯১.২০%) ৯০ শতাংশের বেশি ভোট নথিভুক্ত হয়েছে। ঝাড়গ্রামে ভোট পড়েছে ৯০.৫৩ শতাংশ। কালিম্পং জেলায় ভোটদানের হার ছিল ৮১.৯৮ শতাংশ, যা পাহাড়ি অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের নিরিখে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।
অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে কমিশন এবার নজিরবিহীন কড়া পদক্ষেপ নিয়েছিল। রাজ্যে মোট ২৪৫০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারি এবং স্পর্শকাতর এলাকায় বিশেষ পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করেছে। তবে উৎসবের আবহেও বেশ কিছু জায়গায় অশান্তির কালো ছায়া দেখা গেছে। বীরভূমের খয়রাশোলে ইভিএম বিকল হওয়াকে কেন্দ্র করে জনতা ও পুলিশের মধ্যে তীব্র খণ্ডযুদ্ধ বাঁধে। ক্ষুব্ধ জনতা একটি পুলিশ ভ্যান ভাঙচুর করে এবং ইঁটবৃষ্টির ফলে এক নিরাপত্তা কর্মীর মাথা ফেটে যায়। দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকারের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে, তৃণমূল কর্মীদের ধাওয়ার মুখে তাঁকে মাঠ দিয়ে পালাতে দেখা যায়। এছাড়া আসানসোলে বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের গাড়িতে পাথর বৃষ্টি হয়, যার ফলে গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায়। মুর্শিদাবাদের নওদাতে হুমায়ুন কবীরের কনভয়ে হামলার ঘটনা এবং বহরমপুরের পীরতলায় কংগ্রেস এজেন্টদের মারধরের অভিযোগ নিয়ে দিনভর উত্তেজনা বজায় ছিল। পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরে ভোট দিয়ে ফেরার পথে এক বৃদ্ধার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যদিও প্রশাসনের প্রাথমিক অনুমান এটি স্বাভাবিক মৃত্যু।
পাশাপাশি দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ুতে এদিন ২৩৪টি আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। এখানকার রাজনৈতিক লড়াই এবার ছিল ত্রিমুখী এবং অত্যন্ত রুদ্ধশ্বাস, যা ভোটারদের মধ্যে বাড়তি উন্মাদনা তৈরি করেছিল। তামিলনাড়ুর ইতিহাসে স্বাধীনতার পর থেকে এটিই সর্বোচ্চ ভোটদানের হার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সকাল ৭টায় ভোট শুরু হওয়ার পর থেকেই গতির গ্রাফ ছিল উর্ধ্বমুখী। প্রথম দুই ঘণ্টাতেই প্রায় ১৮ শতাংশ ভোট পড়ে গিয়েছিল। দুপুর ১টার মধ্যেই ৫৬.৮১ শতাংশ ভোট পড়ার পর সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ তা ৮৪ শতাংশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ৮৫.০৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। জেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যানে কারুর জেলা ৯২.০৪ শতাংশ ভোট দিয়ে নজির তৈরি করেছে। নামাক্কল (৮৭.৬৩%), সালেম (৮৮%) ও ইরোড (৮৭.৫৯%) জেলাতেও ভোটদানের হার আকাশছোঁয়া। চেন্নাইয়ের মতো মেগাসিটিতেও ভোটদানের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৩.৪৪ শতাংশ, যা শহরাঞ্চলের ভোটারদের ক্রমবর্ধমান সক্রিয় অংশগ্রহণের অকাট্য প্রমাণ।
তামিলনাড়ুতে এবার মূল লড়াই ডিএমকে নেতৃত্বাধীন 'সেক্যুলার প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স' এবং এআইএডিএমকে-বিজেপি জোটের মধ্যে থাকলেও বড় চমক ছিল সুপারস্টার থলপতি বিজয়ের দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম’ (টিভিকে)। ২৩৪টি আসনেই নিজস্ব প্রার্থী দিয়ে বিজয় এবার প্রথাগত দুই বৃহৎ জোটের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছেন। তামিলনাড়ুর বুথগুলিতে আজ ছিল চাঁদের হাট। মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন, উপ-মুখ্যমন্ত্রী উদয়নিধি স্ট্যালিন এবং অভিনেতা বিজয় নিজে সাধারণ মানুষের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। পাশাপাশি মেগাস্টার রজনীকান্ত, কমল হাসান, ধনুশ, অজিত কুমার, সূর্যা, জ্যোতিকা এবং ক্রিকেটার রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে সস্ত্রীক ভোট দিতে দেখা গেছে। এদিন রজনীকান্ত সংবাদমাধ্যমকে জানান, গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালন করা প্রত্যেক নাগরিকের পরম কর্তব্য। কাঞ্চিপুরমে এক নবদম্পতি বিয়ের পিঁড়ি থেকে সরাসরি মণ্ডপ থেকে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে যান। তবে পোরাইয়ার এলাকায় এক পুলিশ কনস্টেবলের ওপর ছুরি হামলার ঘটনা কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ শতাংশের ভোটদান সাধারণত বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক প্রকার জনরোষ বা বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে মনে করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার ১৫২টি আসনে ১৪৭৮ জন প্রার্থীর ভাগ্য এখন অন্ধকার ইভিএম-এর ঘরে বন্দি। আগামী ২৯ এপ্রিল বাংলায় দ্বিতীয় তথা শেষ দফার ভোটগ্রহণ হবে বাকি ১৪২টি আসনে। কৃষ্ণনগর ও মথুরাপুরের সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দাবি করেছেন, এই বিপুল ভোটদান তৃণমূলের ‘বিদায় ঘণ্টা’ বাজিয়ে দিয়েছে এবং সিএএ-এর মাধ্যমে শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, প্রথম দফার ভোট ইঙ্গিত দিচ্ছে তৃণমূল একাই সরকার গড়ার মতো জায়গায় পৌঁছে গেছে এবং বিজেপির দাঙ্গা ও বিভাজনের রাজনীতি মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। ১৭টি দেশের ৩৪ জন প্রতিনিধি ভারতের এই বিশালাকার নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তাঁরাও বিপুল জনসমাবেশ দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। একদিকে প্রধানমন্ত্রীর 'আস্থার জয়' এবং অন্যদিকে তৃণমূল নেত্রীর 'অধিকার রক্ষার লড়াই'— এই দ্বৈরথে শেষ হাসি কে হাসবে, তা জানতে এখন অপেক্ষা ৪ মে-র সকাল পর্যন্ত। মোটের ওপর প্রশাসনিক তৎপরতায় বড় কোনো বিপর্যয় ছাড়াই প্রথম দফার এই মহারণ সম্পন্ন হলো।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি